
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করেই একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চায় সরকার। নাগরিকের দলীয় পরিচয়, ধর্ম কিংবা বর্ণের ভিন্নতা যেন অধিকার ও মর্যাদার ক্ষেত্রে কোনো বৈষম্য তৈরি না করে-এটাই রাষ্ট্রের অন্যতম লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া ভাষণে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। সাধারণ পরিষদ হলে নিউইয়র্ক সময় বিকেলে তিনি বাংলায় বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরেন।
নাগরিকদের ক্ষমতায়নের বাইরে রেখে কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না মন্তব্য করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতাকে ভিত্তি করেই উন্নয়ন এগিয়ে নিতে হবে।
কর্মসংস্থান ও উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে গুরুত্ব
বাংলাদেশের সামনে সম্ভাবনার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, দেশের বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড কাজে লাগিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে।
তরুণ উদ্যোক্তা, গবেষক ও উদ্ভাবকদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। স্টার্টআপ খাতে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী।
প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে পৌঁছানোর লক্ষ্য
সরকারের লক্ষ্য কেবল ভোটের মাধ্যমে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, অর্থনীতিতেও গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা—এমনটি উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল যেন প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়, সেই লক্ষ্যেই কাজ চলছে।
দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি নারী উল্লেখ করে তিনি নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের জন্য নগদ অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি স্নাতক পর্যন্ত নারীদের বিনা বেতনে পড়াশোনার সুযোগ উন্মুক্ত করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডসহ বিভিন্ন কর্মসূচির কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, পরিবারের নারী প্রধানের নামে দেওয়া ‘ফ্যামিলি কার্ড’ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি প্রতীক। ভবিষ্যতে এসব কার্ডকে একটি সমন্বিত ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’-এর আওতায় আনার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলায় বিনিয়োগ
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খেলাধুলাকে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, দেশের ইতিহাসে এবার শিক্ষাখাতে সর্বোচ্চ বাজেট বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। আগামী পাঁচ বছরে ধাপে ধাপে শিক্ষাখাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
শিক্ষাকে আরও কর্মমুখী করতে কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন কারিকুলাম প্রণয়নের কথা জানান তিনি। প্রথম শ্রেণি থেকে প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের ব্যাগ, স্কুল ইউনিফর্ম ও বিনামূল্যে দুপুরের খাবার দেওয়ার উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন।
খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে শিক্ষা সিলেবাসে ‘স্পোর্টস’ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত জুনে দেশব্যাপী মাসব্যাপী ফুটবল টুর্নামেন্টে ২০ লাখের বেশি শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
শহর ও গ্রামের উন্নয়ন বৈষম্য কমানোর পাশাপাশি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি। তাঁর দাবি, জনগণের জন্য ঘোষিত ৩১ দফা কর্মসূচির সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার ‘লিভ নো ওয়ান বিহাইন্ড’ নীতির ৭৩ শতাংশ কার্যক্রমের সরাসরি এবং ২৭ শতাংশের পরোক্ষ সামঞ্জস্য রয়েছে।
প্রযুক্তির সুফল সবার জন্য নিশ্চিত করার আহ্বান
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতির কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রযুক্তির সুবিধা এখনো বিশ্বের সব মানুষের জন্য সমানভাবে নিশ্চিত হয়নি।
তিনি বলেন, ‘আমরা চাই না, আজকের ডিজিটাল বিভাজন আগামী দিনের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের বিভাজনে পরিণত হোক।’
উন্নয়নশীল দেশগুলো যাতে আধুনিক প্রযুক্তিতে সহজ ও সাশ্রয়ী প্রবেশাধিকার পায়, সে জন্য প্রযুক্তি হস্তান্তর ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার আহ্বান জানান তিনি। একই সঙ্গে এআই ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ইতিবাচক ব্যবহার নিশ্চিত করতে জাতিসংঘের কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।
এলডিসি উত্তরণে প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সহায়তা
বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণের অপেক্ষায় রয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এ প্রক্রিয়াকে টেকসই করতে অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশের সুযোগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অব্যাহত থাকা জরুরি।
আঞ্চলিক বাণিজ্য ও যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, পারস্পরিক সহযোগিতা ছাড়া বর্তমান বিশ্বে কোনো দেশের এককভাবে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। কোভিড-১৯ মহামারিও পারস্পরিক নির্ভরতা ও সহযোগিতার গুরুত্ব সামনে এনেছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
সংঘাত নিরসনে কূটনীতির ওপর জোর
বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে সংঘাতের কারণে বাস্তুচ্যুতি, মানবিক সংকট, জ্বালানি নিরাপত্তাহীনতা ও অর্থনৈতিক চাপের প্রসঙ্গ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব সংকটের সমাধান আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার পথেই খুঁজতে হবে।
বিবদমান দেশগুলোর সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ এবং একে অপরের সম্মান ও মর্যাদার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এ ধরনের সমঝোতামূলক বিশ্বব্যবস্থা গঠনে জাতিসংঘকে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখার কথাও বলেন।
বাংলাদেশের নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ ও অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা এবং ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতিও সমর্থন জানান।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আন্তর্জাতিক ভূমিকা চান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে। দীর্ঘদিনের এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ বাড়ছে।
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত।’ নিরাপদে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই এ সংকটের একমাত্র সমাধান বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত জীবন রক্ষাকারী সহায়তা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আরও কার্যকর সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
জলবায়ু মোকাবিলায় নতুন কর্মসূচি
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী কপ-৩১ সম্মেলনে জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তার বিষয়ে আরও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান।
আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো, পরিচ্ছন্ন ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় দেশজুড়ে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
এ ছাড়া তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্পের মাধ্যমে পানি সংরক্ষণ এবং মিঠা পানির প্রবাহ বাড়ানোর উদ্যোগের কথা তুলে ধরেন। আন্তঃসীমান্ত পানি ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতিও দেন তিনি।
নিরাপদ অভিবাসন ও শান্তিরক্ষায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার
নিরাপদ, নিয়মিত ও সুশৃঙ্খল অভিবাসন নিশ্চিত করার বিষয়ে বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী অভিবাসীদের অধিকার, মর্যাদা ও কল্যাণ রক্ষায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা আরও জোরদারের আহ্বান জানান।
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবদানের কথাও উল্লেখ করেন তিনি। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা মানবতার সেবায় কাজ করছেন জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশি নারীদের অংশগ্রহণ ‘নারী, শান্তি ও নিরাপত্তা’ কর্মসূচির প্রতি দেশের অঙ্গীকারের প্রতিফলন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য-‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’-উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।
তথ্যসূত্র: চ্যানেল ২৪



