ট্রাম্পের হুমকির পর জি-৭-এর বড় সিদ্ধান্ত, ১০ কোটি ব্যারেল তেল-ডিজেল ছাড়বে জি-৭

সরবরাহ সংকটে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে বাজারে ১০ কোটি ব্যারেল তেল ও ডিজেল ছাড়ার বিষয়ে একমত হয়েছে জি-৭ জোট। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়ার কথা জানিয়েছে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর এই জোট।
জি-৭-এর সদস্য দেশগুলো হলো যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, জাপান, জার্মানি, ইতালি ও ফ্রান্স। ইউরোপীয় ইউনিয়নও বৈঠকে প্রতিনিধিত্ব করে।
জি-৭ নেতাদের বৈঠকের পর ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল ম্যাক্রঁ জানান, জোটটি চার মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি মজুত থেকে বাজারে ছাড়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। এই কার্যক্রম আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার (আইইএ) সমন্বয়ে পরিচালিত হবে।
জি-৭-এর যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইইএর মাধ্যমে চার মাস ধরে সমন্বিতভাবে ১০ কোটি ব্যারেল জ্বালানি বাজারে ছাড়ার কার্যক্রম অবিলম্বে শুরু হবে। এর প্রথম ২০ দিনের মধ্যেই জি-৭ সদস্য ও অংশীদার দেশগুলো উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডিজেল বাজারে ছাড়বে।
তবে কোন কোন অংশীদার দেশ তাদের মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়বে এবং কত দ্রুত তা করবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানা যায়নি। ১০ কোটি ব্যারেলের এই মজুতে ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল-দুটিই থাকবে।
যুক্তরাজ্যের প্রতিনিধিত্ব করা পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড বলেন, এসব পদক্ষেপ জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল করবে, সরবরাহ ব্যবস্থার সক্ষমতা বাড়াবে এবং পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব থেকে সুরক্ষা দেবে।
এর আগে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছিলেন, ইউরোপীয় দেশগুলো নিজেদের মজুত থেকে আরও জ্বালানি বাজারে না ছাড়লে যুক্তরাষ্ট্র ডিজেল রপ্তানি বন্ধ করে দিতে পারে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে এমন পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর দামের চাপ কিছুটা কমাতে পারে। তবে এতে বিশ্বের অন্য দেশগুলোতে ডিজেলের দাম বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।

শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ট্রাম্প বলেন, “ইউরোপ তাদের বিপুল পরিমাণ মজুত ডিজেল ছাড়তে সম্মত হয়েছে। এই প্রক্রিয়া অবিলম্বে শুরু হবে।”
মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এর আগে বলেছিলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার পুরো বোঝা যেন মার্কিন কৃষক, ট্রাকচালক ও ব্যবসায়ীদের ওপর না পড়ে।
তবে পরে হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প বলেন, ডিজেল রপ্তানি নিষিদ্ধ করার বিষয়টি ‘আসলে কখনোই টেবিলে ছিল না’।
জি-৭-এর যৌথ বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, সদস্য দেশগুলো একে অপরের বিরুদ্ধে জ্বালানি ও জ্বালানি-জাতীয় পণ্যের রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ থেকে বিরত থাকবে। জোটের নেতারা ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখার কথাও জানিয়েছেন।
বিশ্ববাজারের গুরুত্বপূর্ণ সূচক অপরিশোধিত তেলের দাম সাময়িকভাবে ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের নিচে নেমে গেলেও শুক্রবার সন্ধ্যায় আবার প্রায় ১০২ ডলারে উঠে যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে হামলা চালানোর আগে এর দাম ছিল প্রায় ৭৩ ডলার।
কেপলারের কমোডিটি গবেষণা পরিচালক ম্যাট স্মিথ বলেন, সৌদি আরব ও ইয়েমেনের হুথিদের মধ্যে নতুন করে হামলা শুরুর গুজবের কারণে তেলের দাম আবার বেড়েছে।
তিনি বলেন, ইউরোপ কৌশলগত মজুত থেকে জ্বালানি ছাড়ার ঘোষণা দেওয়ার পর তেলের দাম দ্রুত কমছিল। তবে সৌদি আরব ইয়েমেনে সামরিক অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করছে-এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর দাম আবার ঘুরে দাঁড়ায়। এর লক্ষ্য হতে পারে বাব-আল-মান্দেব নৌপথকে নিরাপদ করা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যুদ্ধ এবং রাশিয়া ও চীন থেকে সরবরাহ কমে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে ইউরোপীয় দেশগুলো মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধের হুমকির বিরোধিতা করেছিল।
জি-৭ নেতারা রিফাইনারিগুলোর রক্ষণাবেক্ষণের সময়সূচি সমন্বয় করার সিদ্ধান্তও জানিয়েছেন, যাতে একই সময়ে একাধিক রিফাইনারি বন্ধ না থাকে। পাশাপাশি যেসব দেশের অতিরিক্ত পরিশোধন সক্ষমতা রয়েছে, তাদের বিশেষ করে ডিজেল উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহিত করা হবে।
মার্কিন ডিজেল রপ্তানি বন্ধ না হওয়া যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, কারণ তারা ডিজেল আমদানির ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল। শুক্রবার যুক্তরাজ্যে প্রথমবারের মতো পাম্পে ডিজেলের দাম প্রতি লিটার ২ পাউন্ডের বেশি হয়েছে।
যুক্তরাজ্যে ব্যবহৃত ডিজেলের অর্ধেকেরও বেশি আমদানি করা হয়। এর মধ্যে ৩১ শতাংশ আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে।
যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের অন্যতম প্রধান ডিজেল সরবরাহকারী দেশ। মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের তথ্য অনুযায়ী, দেশটির রিফাইনারিগুলো প্রতিদিন প্রায় ৪ থেকে ৫ মিলিয়ন ব্যারেল জ্বালানি উৎপাদন করে।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিদিন প্রায় ৩ দশমিক ৬ মিলিয়ন ব্যারেল ব্যবহার হয়। বাকি প্রায় ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৫ মিলিয়ন ব্যারেল প্রতিদিন রপ্তানি করা হয়। ফলে বৈশ্বিক ডিজেল বাজারে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ডিজেল সরবরাহ ব্যাপকভাবে কমে এসেছে। এতে অপরিশোধিত তেল ও পরিশোধিত ডিজেল-দুটোরই বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যাহত হয়েছে।

অন্যদিকে রাশিয়াও ডিজেলের অন্যতম বড় উৎপাদক। ইউক্রেনের হামলায় রাশিয়ার কয়েকটি রিফাইনারি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর দেশটি নিজস্ব ডিজেল রপ্তানি নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেছে। এতে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ আরও কমেছে।
ডিজেল পরিশোধন করা পেট্রোলের তুলনায় বেশি জটিল। পাশাপাশি পরিবহন ও কৃষিতে ডিজেলের ব্যাপক প্রয়োজন থাকায় এর চাহিদা দ্রুত কমানোও কঠিন।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা



