প্রয়োজনীয় তথ্য
প্রধান খবর

ইতিহাস বদলে বিশ্ব রাজনীতির মোড় ঘোরানো কিছু গণভোট

গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার বলা হয় ‘গণভোট’কে। একটি ভোট যখন কোনো দেশের সংবিধান, সীমানা বা জাতির ভবিষ্যৎ চিরতরে বদলে দেয়, তখন তা আর কেবল একটি নির্বাচন থাকে না-এটি হয়ে ওঠে ইতিহাসের মাইলফলক। গত কয়েক দশকে এমন বেশ কিছু গণভোট বিশ্ব রাজনীতির গতিপথ বদলে দিয়েছে।

বাংলাদেশেও আজ এমন এক নির্বাচনের প্রাক্কালে দাঁড়িয়ে রয়েছে দেশ। সেই প্রেক্ষাপটে ফিরে দেখা যাক ইতিহাস বদলে দেওয়া কিছু গণভোট।

যুক্তরাজ্যের ব্রেক্সিট গণভোট (২০১৬)

ব্রেক্সিট ছিল ব্রিটিশ সমাজের গভীর বিভাজনের প্রতিফলন। কনজারভেটিভ পার্টির অভ্যন্তরীণ কোন্দল মেটাতে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন গণভোটের প্রতিশ্রুতি দেন।

প্রশ্ন ছিল-যুক্তরাজ্য ইউরোপীয় ইউনিয়নে থাকবে, নাকি বেরিয়ে যাবে? ‘লিভ’ পক্ষ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং ইইউকে দেওয়া সাপ্তাহিক কোটি কোটি পাউন্ড সাশ্রয়ের দাবি তোলে।

ফলাফলে প্রায় ৫২ শতাংশ ভোটার ইইউ ছাড়ার পক্ষে রায় দেন। ২০২০ সালে যুক্তরাজ্য আনুষ্ঠানিকভাবে ইইউ থেকে বেরিয়ে যায়—যা ইউরোপীয় রাজনীতি ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় প্রভাব ফেলে।

কানাডার কুইবেক সার্বভৌমত্ব গণভোট (১৯৯৫)

কানাডার অস্তিত্বের জন্য এটি ছিল এক গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। ফরাসিভাষী কুইবেকবাসীরা মনে করতেন, তাদের সংস্কৃতি ইংরেজিভাষীদের চাপে হারিয়ে যাচ্ছে।

ভোটের প্রশ্ন ছিল জটিল-সরাসরি ‘স্বাধীনতা’ নয়, বরং ‘সার্বভৌমত্ব ও নতুন অংশীদারিত্ব’। শেষ পর্যন্ত মাত্র ০.৬ শতাংশ ভোটের ব্যবধানে কুইবেক কানাডার অংশ হিসেবেই থেকে যায়।

পরাজয়ের পর নেতা লুসিয়ান বুশার বলেছিলেন, “আমরা হারিনি, সময় আমাদের থেকে কিছু মুহূর্ত ছিনিয়ে নিয়েছে মাত্র।”

স্কটল্যান্ডের স্বাধীনতা গণভোট (২০১৪)

স্কটল্যান্ড যুক্তরাজ্যের অংশ হিসেবেই থাকবে, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে-এই প্রশ্নে ২০১৪ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় গণভোট।

ফলাফলে ৫৫.৩ শতাংশ ভোটার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে থাকার পক্ষে মত দেন, আর ৪৪.৭ শতাংশ ভোটার স্বাধীনতার পক্ষে ভোট দেন। প্রায় ৮৫ শতাংশ ভোটার অংশগ্রহণ করেন-যা স্কটল্যান্ডের ইতিহাসে বিরল।

কাতালোনিয়া স্বাধীনতা গণভোট (২০১৭)

স্পেনের কাতালোনিয়া অঞ্চলে স্বাধীনতার দাবিতে ২০১৭ সালে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। ভোটারদের অধিকাংশ স্বাধীনতার পক্ষে মত দিলেও স্পেন সরকার একে অসাংবিধানিক ও অবৈধ ঘোষণা করে।

ফলে কেন্দ্রীয় সরকার ও কাতালোনিয়ার মধ্যে তীব্র রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়, যা স্পেনের রাজনীতিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলে।

পূর্ব তিমুর স্বাধীনতা গণভোট (১৯৯৯)

ইন্দোনেশিয়া থেকে আলাদা হওয়ার প্রশ্নে অনুষ্ঠিত এই গণভোটে জনগণ পূর্ণ স্বাধীনতার পক্ষে রায় দেয়। ইন্দোনেশিয়া সরকার কেবল স্বায়ত্তশাসন দিতে চেয়েছিল।

ফল ঘোষণার পর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ে। ইন্দোনেশিয়াপন্থী মিলিশিয়ারা ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দেয় এবং হাজার হাজার মানুষ নিহত হন। পরে অস্ট্রেলিয়ার নেতৃত্বে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নেয়।

দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা (২০১১)

দীর্ঘ ২০ বছরের গৃহযুদ্ধের অবসান ঘটাতে অনুষ্ঠিত গণভোটে স্বাধীনতার পক্ষে বিপুল সমর্থন আসে। ফলে দক্ষিণ সুদান আফ্রিকার নতুন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

তবে স্বাধীনতার পর তেলের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দেশটি আবারও অভ্যন্তরীণ সংকটে পড়ে।

ক্রিমিয়া গণভোট (২০১৪)

ইউক্রেনের ক্রিমিয়া অঞ্চল রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হবে কি না-এই প্রশ্নে ২০১৪ সালের ১৬ মার্চ গণভোট অনুষ্ঠিত হয়।

ঘোষিত ফল অনুযায়ী, প্রায় ৯৫.৫ শতাংশ ভোটার রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে মত দেন। তবে ভোট প্রক্রিয়া ঘিরে তীব্র বিতর্ক ছিল। পশ্চিমা দেশগুলো একে অবৈধ ঘোষণা করে এবং ইউক্রেনের সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগ তোলে।

এর ফলে বিষয়টি আঞ্চলিক ইস্যু থেকে বৈশ্বিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নে পরিণত হয়।

উপসংহার

গণভোট কখনো কেবল একটি ভোট নয়-এটি হতে পারে একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের মুহূর্ত। কোথাও এটি ঐক্য রক্ষা করেছে, কোথাও সৃষ্টি করেছে বিভাজন; কোথাও এনেছে স্বাধীনতা, আবার কোথাও তৈরি করেছে দীর্ঘমেয়াদি সংকট।

বাংলাদেশ আজ যখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের দ্বারপ্রান্তে, তখন ইতিহাসের এই উদাহরণগুলো নতুন করে ভাবনার খোরাক জোগায়।

তথ্যসূত্র: কালের কণ্ঠ

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button