আন্তর্জাতিক খবর
প্রধান খবর

সিইসির পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ, দিল্লিতে কেজরিওয়াল-মমতাসহ বহু নেতা আটক

ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে পূর্বনির্ধারিত বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে রাজধানী দিল্লিতে ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে পুলিশ। শনিবার (১০ অক্টোবর) বিক্ষোভ শুরুর আগেই ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করা হয়। পরে দিল্লির সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়াল, তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, ইউটিউবার ধ্রুব রাঠীসহ আরও কয়েকজনকে আটক করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ছবি: এএফপি

সংবাদমাধ্যমগুলোর সূত্রমতে, দিল্লির লোধি এস্টেটে নিজের বাসার সামনে থেকে আটক করা হয় সাবেক মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরিওয়ালকে। এর আগে ত্রিপুরার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মানিক সরকার ও কেরালার সাবেক মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়নকেও আটক করা হয়।

তৃণমূল কংগ্রেসের (টিএমসি) সংসদ সদস্য সাকেত গোখলে জানান, দলের নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়সহ বেশ কয়েকজন টিএমসি নেতাকে দিল্লিতে তাঁদের বাসভবনের বাইরে থেকে আটক করেছে পুলিশ। এ ছাড়া দিল্লির বিভিন্ন স্থান থেকে পিনারাই বিজয়নসহ সিপিআই(এম)-এর কয়েকজন নেতাকে আটক করা হয়েছে। পাঞ্জাবের চণ্ডীগড় থেকেও আম আদমি পার্টির (আপ) নেতা মনীশ সিসোদিয়াসহ বেশ কয়েকজনকে আটকের খবর পাওয়া গেছে।

ইউটিউবে প্রায় ৩ কোটি ৩০ লাখ অনুসারী থাকা জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ধ্রুব রাঠীকেও গুরুগ্রামের সেক্টর ৫৬-এ তাঁর বাসা থেকে আটক করেছে দিল্লি পুলিশ। সিজেপির বিক্ষোভে যোগ দিতে আসা ধ্রুব রাঠীকে সমাবেশের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।

ছবি: ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

শনিবার সকালে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ শুরু হওয়ার কয়েক ঘণ্টা আগে বিমানবন্দর থেকেই সিজেপির শীর্ষ তিন নেতা অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে আটক করা হয়। তাঁদের কোথায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে জানানো হয়নি। পরে সিজেপির এক ভিডিও বার্তায় জানানো হয়, অজিনক্য শিন্ডে যন্তর মন্তরের বিক্ষোভে নেতৃত্ব দেবেন।

যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার পথে অন্তত ২০০ বিক্ষোভকারীকে আটকে দেয় পুলিশ। পরে আন্দোলনকারীরা সবাইকে দিল্লি হাটের দিকে মিছিল করার আহ্বান জানান।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে সিজেপি, সর্বভারতীয় ছাত্র সমিতি (এআইএসএ) ও অন্যান্য সংগঠনের ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে রাজধানী দিল্লি। কর্মসূচি ঠেকাতে দিল্লি মেট্রোর ৪৫টি স্টেশন বন্ধ, একাধিক ট্রেন বাতিল এবং মধ্য দিল্লিতে মুঠোফোনের ইন্টারনেট সেবা স্থগিত করাসহ ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) সন্ধ্যা থেকেই রাজধানীজুড়ে প্রায় ৩০ হাজার পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করে বহুস্তরীয় নিরাপত্তাবলয় গড়ে তোলা হয়। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রসচিব গোবিন্দ মোহন সব রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের প্রশাসনকে চিঠি দিয়ে শনিবারের সমাবেশ নিষিদ্ধ করার কথা জানান। একই সঙ্গে দিল্লির গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।

দিল্লি পুলিশ জানিয়েছে, বিক্ষোভ আয়োজনের জন্য প্রয়োজনীয় অনুমতি আয়োজকদের ছিল না। জনস্বার্থের কথা বিবেচনা করে তাঁদের আবেদন বাতিল করা হয়েছে।

কর্মসূচিকে সামনে রেখে যন্তর মন্তর ও সেখানে যাওয়ার সব রাস্তায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এমনকি যন্তর মন্তরে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রবেশেও কড়াকড়ি আরোপ করা হয়। রাজধানীর তিনটি প্রধান প্রবেশ ও প্রস্থান পয়েন্টে লাউডস্পিকারে হিন্দি ও ইংরেজিতে ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারার অধীনে সমাবেশ, মিছিল ও সড়ক অবরোধ নিষিদ্ধ থাকার বিষয়ে সতর্ক করা হয়।

দিল্লি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সম্ভাব্য জমায়েত নিয়ন্ত্রণে তাদের নিজস্ব ১৫ হাজারের বেশি সদস্য এবং কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রায় ২৬ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হয়।

নিরাপত্তাব্যবস্থার কারণে দিল্লির গণপরিবহনেও ব্যাপক প্রভাব পড়ে। দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন (ডিএমআরসি) শুক্রবার রাত ৯টা থেকে পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত ৪৫টি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান ফটক বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

এ ছাড়া ন্যামো ভারত ট্রেনের সরাই কালে খাঁ ও নিউ অশোক নগর স্টেশন দুটি ৯ অক্টোবর রাত ৯টা থেকে ১০ অক্টোবর রাত ১০টা পর্যন্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

সড়কে তীব্র যানজটের আশঙ্কায় শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলওয়ে স্টেশনে পৌঁছানোর নির্ধারিত সব মেইল ও এক্সপ্রেস ট্রেন যাত্রার শুরুর স্টেশন থেকেই বাতিল করে ভারতীয় রেলওয়ে। পাশাপাশি আবগারি দপ্তরের নির্দেশনায় ৯ ও ১০ অক্টোবর পুরো দিল্লিতে খুচরা মদের দোকান বন্ধ রাখা হয়।

ভোটার তালিকা সংশোধনে জালিয়াতির অভিযোগ তুলে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে গত ২ অক্টোবর মুম্বাইয়ে বিক্ষোভ করেছিল সিজেপি। সেই ধারাবাহিকতায় দিল্লিতে নতুন করে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়।

সংবাদমাধ্যম দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের পর নির্বাচন কমিশনে জ্ঞানেশ কুমারের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক আরও তীব্র হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ১০ মাসে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রমসংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও পদ্ধতি নিয়ে অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক জোশী অন্তত ১৪ বার আপত্তি জানিয়েছিলেন।

সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে অভিযোগ করেন, ২০২৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত ভোটার তালিকা থেকে প্রায় ১৩ কোটি ভোটারের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ক্ষমতাসীন এনডিএ ও বিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের প্রাপ্ত ভোটের ব্যবধান কম থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, ভোটার তালিকায় এত বড় পরিবর্তন নির্বাচনের ফলাফলে প্রভাব ফেলে থাকতে পারে।

তবে এসব অভিযোগ পুরোপুরি অস্বীকার করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন। সংস্থাটির দাবি, ভোটার তালিকার এসআইআর-সংক্রান্ত সব বড় সিদ্ধান্ত পুরো কমিশনের সর্বসম্মতিক্রমে নেওয়া হয়েছিল।

এক বিবৃতিতে সিজেপি অভিযোগ করেছে, বিক্ষোভস্থলে পৌঁছানোর আগেই নেতৃত্বকে অকার্যকর করে দিতে দিল্লি পুলিশ পূর্বপরিকল্পিতভাবে দলটির নেতাদের আটক করেছে। শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ভণ্ডুল করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে দলটি।

বিবৃতিতে সিজেপি আরও বলেছে, এ ঘটনা চলাচলের স্বাধীনতার স্পষ্ট লঙ্ঘন। দলটি অভিজিৎ দীপকে, সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকার অবিলম্বে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে।

তথ্যসূত্র: টিবিএস নিউজ

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button