
রাজনৈতিক দলগুলোর অনীহা এবং আমলাতান্ত্রিক চাপের কারণে জুলাই সনদের মূল লক্ষ্য অর্জনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। একই সঙ্গে প্রশাসনে একক প্রভাবের পরিবর্তে ত্রিমুখী প্রভাব বেড়েছে এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হওয়া নিয়েও গুরুতর শঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছে সংস্থাটি।
সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) সকালে রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কনফারেন্স রুমে ‘কর্তৃত্ববাদ পতন-পরবর্তী দেড় বছর: প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান।
ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, জুলাই আন্দোলনের পর রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্র কোনো বাস্তব শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ঐকমত্য কমিশনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত রাজনৈতিক দল ও আমলাতন্ত্রের বক্তব্যের সারকথা ছিল-সরকারের ‘হাত-পা বেঁধে দেওয়া যাবে না’। জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা নিশ্চিত করতে যে চেক অ্যান্ড ব্যালান্স প্রয়োজন, তা প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার বিরোধিতা করা হয়েছে প্রতিটি ক্ষেত্রেই।
ভোটের মাঠে ‘মব’ বা দলবদ্ধ সহিংসতার আশঙ্কা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাংলাদেশে মব সংস্কৃতির উৎপত্তি সরকারের ভেতর থেকেই হয়েছে। সরকারের পরিচালন কেন্দ্র সচিবালয় থেকেও এর উৎস দেখা যায়। সরকার মবকে ক্ষমতায়িত করায় শাসনের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়েছে। এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না আনলে নির্বাচনে মব বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ৩১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিচার, সংস্কার, নির্বাচন, রাষ্ট্র পরিচালনা, অনিয়ম-দুর্নীতি ও অংশীজনদের ভূমিকা নিয়ে এই গবেষণা পরিচালিত হয়। এতে জুলাই আন্দোলনে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ, জুলাই যোদ্ধাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগ, রাষ্ট্র সংস্কারসহ মোট ১৮টি পদক্ষেপের অগ্রগতি ও ঘাটতি বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার প্রসঙ্গে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারক ও কৌঁসুলিদের নিয়োগ নিয়েও বিতর্ক রয়েছে। গুমসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের তদন্ত ও বিচারে র্যাব বিলুপ্তি এবং গোয়েন্দা সংস্থার সংস্কার সংক্রান্ত সুপারিশ বাস্তবায়নে সরকার নেতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।
জুলাই যোদ্ধাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট উদ্যোগের ক্ষেত্রে কিছু ক্ষেত্রে অনুদান প্রদানে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই সঙ্গে জুলাই গণ-অভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর নির্মাণে সরকারি ক্রয় নীতিমালা অনুসরণে ঘাটতির কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।
অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিরোধ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৪৯ জন হাইপ্রোফাইল ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধান শুরু হলেও এর অগ্রগতি আশাব্যঞ্জক নয়। উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণী প্রকাশের প্রতিশ্রুতি থাকলেও তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে টিআইবি জানায়, দাবি আদায়ে বারবার সড়ক অবরোধ রোধে সরকারের কার্যকর উদ্যোগ নেই। আন্দোলন দমনে পুলিশের ভূমিকায় বৈষম্য লক্ষ্য করা গেছে। আর্থিক খাতে টাকা ছাপানো বন্ধ হয়নি, ব্যবসায় সিন্ডিকেটের প্রভাব অব্যাহত রয়েছে, রাজস্ব ঘাটতি ও দারিদ্র্য বেড়েছে এবং বিনিয়োগ কমেছে। অর্থনৈতিক সংস্কার সংক্রান্ত শ্বেতপত্রের সুপারিশও গুরুত্ব পায়নি।
নির্বাচন প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে সারা দেশে ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ১০২ জন নিহত হয়েছেন এবং এক হাজার ৩৩৩টি অস্ত্র নিখোঁজ হয়েছে। সহিংসতা, রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের হেনস্তা, সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর হামলা এবং ৫০টির বেশি সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার ঘটনা নির্বাচনী পরিবেশকে উদ্বেগজনক করে তুলেছে।
এ ছাড়া থানা থেকে লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া এবং নতুন করে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়ার উদ্যোগ সহিংসতার ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে বলে মনে করছে টিআইবি।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, নির্বাচনে দায়িত্ব পালনকারী জনবলের মাত্র ৯-১০ শতাংশ পুলিশ সদস্য হওয়ায় সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় ঘাটতি রয়েছে। মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি, উপদেষ্টাদের দলীয়করণ এবং নিরপেক্ষতা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছে। ৪৬টি আসনের সীমানা পুনর্নির্ধারণ নিয়ে উচ্চ আদালতে অন্তত ২৭টি রিট দায়ের হয়েছে এবং প্রায় ১২ হাজার ৫৩১টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভোটকেন্দ্র হিসেবে অনুপযোগী।
টিআইবির পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, প্রতিটি বড় রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধেই নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও নির্বাচন কমিশনের কঠোর অবস্থানের অভাব স্পষ্ট।
সব মিলিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকারের কিছু ইতিবাচক উদ্যোগ থাকলেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে অনেক পদক্ষেপই ছিল লোকদেখানো ও অকার্যকর। প্রশাসনে এক মহলের প্রভাব সরিয়ে অন্য মহলের দখলদারিত্ব বেড়েছে। একই সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া এবং মব সংস্কৃতির বিস্তার আগামী নির্বাচনকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।
তথ্যসূত্র: আজকের পত্রিকা



