
রমজান মাসের ২৬ তারিখ দিবাগত রাত, অর্থাৎ ২৭ রমজানের রাতকে প্রচলিতভাবে শবে কদর হিসেবে পালন করা হয়। তবে বিভিন্ন হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী, মাহে রমজানের শেষ দশকের যেকোনো একটি বেজোড় রাতে শবে কদর হতে পারে। ঠিক কোন রাতে শবে কদর হবে তা নির্দিষ্ট করে বলা হয়নি; এমনকি প্রতি বছর তা ভিন্ন রাতেও হতে পারে।
সহিহ বোখারির একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,
“তোমরা রমজানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।”
আর সহিহ মুসলিমের বর্ণনায় এসেছে,
“রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান করো।”
‘লায়লাতুল’ (আরবি) এবং ‘শব’ (ফারসি) শব্দের অর্থ রাত, আর ‘কদর’ শব্দের অর্থ মর্যাদা, মহিমা বা সম্মান। তাই ‘শবে কদর’ অর্থ হলো মহিমান্বিত বা মর্যাদাপূর্ণ রাত।
এই রাতের বিশেষ মর্যাদা সম্পর্কে পবিত্র আল কোরআনে উল্লেখ রয়েছে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
“শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। আমি তো এ কিতাব অবতীর্ণ করেছি এক মুবারক রজনিতে; নিশ্চয়ই আমি সতর্ককারী। এ রজনিতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়।”
– (সুরা দুখান: আয়াত ২-৪)
অন্যদিকে সুরা কদরে বলা হয়েছে-
“নিশ্চয়ই আমি এটি অবতীর্ণ করেছি মহিমান্বিত রজনিতে। আর মহিমান্বিত রজনি সম্পর্কে তুমি কী জানো? মহিমান্বিত রজনি সহস্র মাসের চেয়েও উত্তম। সে রাতে ফেরেশতারা এবং রূহ (জিবরাঈল) তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে প্রত্যেক কাজে অবতীর্ণ হয়। সে রাত শান্তিময়- যা ফজর উদয় হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী।”
– (সুরা কদর: আয়াত ১–৫)
এই রাতকে হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ বলা হয়েছে। অর্থাৎ এই এক রাতের ইবাদতের সওয়াব প্রায় ৮৩ বছরের ইবাদতের চেয়েও বেশি।
ইবনে আবী হাতেম বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ আছে- একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের সামনে বনি ইসরাইলের একজন মুজাহিদের কথা বলেন, যিনি এক হাজার মাস ধরে নিরবচ্ছিন্নভাবে জিহাদে লিপ্ত ছিলেন এবং কখনো অস্ত্র ত্যাগ করেননি। এ কথা শুনে সাহাবিরা আক্ষেপ প্রকাশ করলে তখন সুরা কদর অবতীর্ণ হয়। এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা মুসলিম উম্মাহকে এমন একটি রাত দান করেন, যার এক রাতের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়েও শ্রেষ্ঠ।
মুফাসসির কুরতুবির ব্যাখ্যা অনুযায়ী, শবে কদরের রাতে আগামী এক বছরের বিভিন্ন বিষয়- যেমন মানুষের জীবন, মৃত্যু, রিজিক, বৃষ্টি ইত্যাদির ফয়সালা সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, এই দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাদের মধ্যে আছেন- জিবরাঈল (আ.), মিকাঈল (আ.), ইসরাফিল (আ.) এবং আজরাঈল (আ.)।
শবে কদরের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মাহাত্ম্য হলো— এই রাতেই মানুষের জন্য হেদায়েতের দিশারী পবিত্র আল কোরআন অবতীর্ণ হওয়া শুরু হয়। আল কোরআনের প্রথম নাজিল হওয়া আয়াতগুলো ছিল-
“পড় তোমার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন। সৃষ্টি করেছেন মানুষকে ‘আলাক’ থেকে। পড়, আর তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত; যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন। শিক্ষা দিয়েছেন মানুষকে যা সে জানত না।”
– (সুরা আলাক: আয়াত ১-৫)
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞায়। আর সেই জ্ঞান অর্জনের পথ হলো শিক্ষা। মহান আল্লাহ মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন এবং তাকে ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ হিসেবে মর্যাদা দিয়েছেন।
মাহে রমজান এবং শবে কদর মানুষের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে এক মহান নিয়ামত- যা মানুষের মর্যাদা, সম্মান ও আধ্যাত্মিক উন্নতির বিশেষ সুযোগ এনে দেয়।



