
রিপন দাস: মাঠে উৎপাদনের পর বাজারে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হচ্ছে বিপুল পরিমাণ সবজি ও মসলা। অতিরিক্ত কীটনাশকের ব্যবহার, অপ্রতুল সংরক্ষণব্যবস্থা, স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অনুপযুক্ত প্যাকেজিং ও পরিবহনে অসতর্কতার কারণে বিভিন্ন কৃষিপণ্যের অপচয় কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১২ থেকে ৪০ শতাংশে পৌঁছাচ্ছে। এতে একদিকে কৃষকের উৎপাদন খরচের বড় অংশ নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে ভোক্তার ওপর অর্থনৈতিক চাপ। একই সঙ্গে উৎপাদিত খাদ্যের একটি বড় অংশ ভোক্তার কাছে পৌঁছাতে না পারায় প্রশ্নের মুখে পড়ছে খাদ্য নিরাপত্তা।
বগুড়া পল্লী উন্নয়ন একাডেমির সহযোগিতায় চরস ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ সেন্টার (সিডিআরসি) গত ১৪ বছর ধরে দেশের বড় নদ-নদীর চরাঞ্চলসহ বিভিন্ন এলাকায় গবেষণা চালিয়ে কৃষিপণ্যের উৎপাদন-পরবর্তী অপচয়ের এ চিত্র পেয়েছে।
গবেষণা সংশ্লিষ্টদের মতে, আলু, টমেটো, পেঁয়াজ ও বাঁধাকপিসহ ১০ ধরনের সবজি ও মসলায় অপচয়ের হার তুলনামূলক বেশি। এসব পণ্যের বড় অংশ উৎপাদন করেন প্রান্তিক ও দরিদ্র কৃষক। ফলে ফসলের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বাজারজাত করার আগেই নষ্ট হয়ে গেলে সরাসরি আয় কমে যায় তাদের। এর প্রভাব পড়ে কৃষক পরিবারের জীবনযাত্রা এবং পরবর্তী মৌসুমের উৎপাদন সক্ষমতার ওপর।
কৃষক ও গবেষকদের মতে, দেশে পর্যাপ্ত আধুনিক সংরক্ষণ অবকাঠামো না থাকায় ফসল তোলার পরপরই ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে দ্রুত পচনশীল সবজি ও মসলার ক্ষেত্রে সংগ্রহ, বাছাই, প্যাকেজিং, পরিবহন, বাজারজাতকরণ ও সংরক্ষণ-প্রতিটি ধাপেই অপচয় হচ্ছে।
কৃষকদের অভিযোগ, পরিবহনের সময় অসতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় সংখ্যক বিশেষায়িত হিমাগারের অভাবেই ক্ষতির বড় অংশ হয়। সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় অনেক কৃষক ফসল তোলার পর দ্রুত কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন। আবার কোনো সময় বাজারে চাহিদা কমে গেলে বিক্রি করতে না পেরে মাঠ বা বাড়িতেই নষ্ট হয় বড় অংশের উৎপাদন।
বাংলাদেশে ফল ও সবজির উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির বিভিন্ন গবেষণায়ও সংরক্ষণ, পরিবহন, প্যাকেজিং ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার দুর্বলতাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২৩ সালের একটি গবেষণায় নির্বাচিত এলাকায় কৃষক পর্যায়ে গড় উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতি ১২ দশমিক ৫ শতাংশ এবং পাইকারি বাজারে পৌঁছানো পর্যন্ত ব্যবসায়ী পর্যায়ে আরও ৬ দশমিক ৭ শতাংশ ক্ষতির কথা উঠে আসে।
সিডিআরসির গবেষণায় গ্রামীণ পর্যায়ে প্রচলিত সংরক্ষণ পদ্ধতিকে আধুনিকায়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। গবেষকদের দাবি, স্থানীয় উদ্ভাবনকে আধুনিক প্রযুক্তির সঙ্গে সমন্বয় করতে পারলে কম খরচেই কৃষিপণ্যের অপচয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
গবেষণায় দেখা গেছে, গ্রামীণ উদ্ভাবনী পদ্ধতিগুলোর মধ্যে আলো-আঁধারি পদ্ধতির আধুনিকায়ন ও ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সবজি ও মসলার অপচয় ১৫ দশমিক ৫ থেকে ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব। পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করে এমন মাটির ঘরে আলু সংরক্ষণ করা হলে আলুর অপচয় ৭ দশমিক ৩ শতাংশ পর্যন্ত কমানো যেতে পারে বলেও গবেষণায় উঠে এসেছে।
সিডিআরসির বগুড়ার সিনিয়র টেকনিক্যাল অ্যাডভাইজার ড. এ কে এম জাকারিয়া বলেন, উত্তরাঞ্চলে এখনও অনেক মাটির বাড়ি রয়েছে। এসব বাড়িতে মাচাং তৈরি করে আলু সংরক্ষণ করা সম্ভব।
তিনি বলেন, “মাটির বাড়িতে খুব কম খরচে শুধু একটা ফ্যানিং ব্যবস্থা করে ঘরের ভেতরের গরম বাতাস বের করে দিতে পারলে কোল্ড স্টোরেজের মতো কাজ করবে। এতে আলু পচন বা নষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।”
তার মতে, কৃষকের জন্য দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণ সব সময় প্রয়োজন হয় না। তিন থেকে চার মাস ফসল সংরক্ষণ করতে পারলেই কৃষক সুবিধাজনক সময়ে বাজারে বিক্রি করতে পারবেন।
ড. জাকারিয়া বলেন, “মাটির বাড়িগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। এসব বাড়ি টিকিয়ে রাখার পাশাপাশি কৃষক পর্যায়ে খুব অল্প খরচে আলু সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা সম্ভব। এভাবে পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ধরনের সবজিও সংরক্ষণ করা যায়।”
কৃষকদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, মাঠ পর্যায়ে প্রশিক্ষণ দিয়ে কৃষকের বাড়িগুলোতে সবজি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে একদিকে অপচয় কমবে, অন্যদিকে কৃষক আর্থিকভাবে লাভবান হবেন।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যের উদ্ধৃতি দিয়ে গবেষণা সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশে বছরে প্রায় ৫০ লাখ ১৩ হাজার মেট্রিক টন সবজি ও মসলা নষ্ট হয়। এতে কৃষক ও ভোক্তাদের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৯ হাজার ৫০৮ কোটি টাকা।
তবে বিভিন্ন গবেষণায় ক্ষতির হিসাব ও পদ্ধতিতে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৪ সালে কৃষি মন্ত্রণালয় ও এফএও আয়োজিত এক সেমিনারে উপস্থাপিত তথ্যে বাংলাদেশে ফল ও সবজির বার্ষিক খাদ্য-ক্ষতি ৪০ দশমিক ২ শতাংশ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। সেখানে অপর্যাপ্ত বাছাই ও গ্রেডিং, অনুপযুক্ত প্যাকেজিং, পরিবহন সমস্যা, ওঠানো-নামানোর সময় পণ্যের ক্ষতি এবং পর্যাপ্ত কোল্ড স্টোরেজ ও পোস্টহারভেস্ট প্রযুক্তির ঘাটতিকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
এফএওর বাংলাদেশ বিষয়ক বিনিয়োগ পরিকল্পনাতেও আলু, পেঁয়াজ ও টমেটোর উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির বিষয়টি আলাদাভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সংস্থাটির তথ্যে আলুর ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশের বেশি, পেঁয়াজের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশের বেশি এবং টমেটোর ক্ষেত্রে প্রায় ৪০ শতাংশ পর্যন্ত উৎপাদন-পরবর্তী ক্ষতির কথা উল্লেখ রয়েছে।
কৃষি সংশ্লিষ্টদের মতে, শুধু উৎপাদন বাড়ালেই খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে না; উৎপাদিত ফসল নিরাপদে সংরক্ষণ ও বাজারজাত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ মাঠে উৎপাদিত ফসলের বড় অংশ যদি ভোক্তার হাতে পৌঁছানোর আগেই নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে বাড়তি উৎপাদনের সুফল পুরোপুরি পাওয়া সম্ভব নয়।
বগুড়া কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক মোঃ আব্দুল ওয়াদুদ বলেন, এলাকাভেদে সবজি উৎপাদনের খরচে পার্থক্য রয়েছে। সাধারণত প্রতি হেক্টরে উৎপাদন খরচ ৯ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। বেগুনে প্রতি হেক্টরে প্রায় ২০ হাজার টাকা এবং ফুলকপিতে প্রায় ৯ হাজার টাকা খরচ হয় বলে জানান তিনি।
তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জাতীয় পর্যায়ে সবজি আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১২ লাখ ২০ হাজার হেক্টর। এ জমি থেকে প্রায় ২ কোটি ৬১ লাখ মেট্রিক টন উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। গড় ফলন ধরা হয়েছে প্রতি হেক্টরে ২১ দশমিক ৩৯ মেট্রিক টন। বগুড়া অঞ্চলে বর্তমানে প্রতি হেক্টরে প্রায় ২১ দশমিক ৩৭ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যাচ্ছে। তবে বোরো মৌসুমে উৎপাদন গড় ফলনের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
গবেষকদের মতে, কৃষিপণ্য উৎপাদনের পরপরই দ্রুত ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা না গেলে অপচয় কমানো কঠিন। এজন্য স্থানীয় পর্যায়ে কম খরচের সংরক্ষণ প্রযুক্তির প্রসার, বিশেষায়িত হিমাগারের সংখ্যা বাড়ানো, উন্নত পরিবহন ও প্যাকেজিং ব্যবস্থা চালু এবং কৃষকদের উৎপাদন-পরবর্তী ব্যবস্থাপনায় প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উৎপাদন-পরবর্তী অপচয় কমানো গেলে একই পরিমাণ জমিতে উৎপাদিত খাদ্যের কার্যকর সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে। এতে কৃষকের লোকসান কমার পাশাপাশি বাজারে সরবরাহের চাপ কমবে এবং ভোক্তার জন্য খাদ্যের প্রাপ্যতা ও মূল্যস্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করবে।



