
বগুড়ায় এবার কোরবানির পশুর চামড়ার বাজারে হতাশার চিত্র দেখা গেছে। ব্যবসায়ীদের দাবি, গত বছরের তুলনায় চামড়ার সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ কমলেও গরুর চামড়ার দাম কিছুটা বেড়েছে। তবে বিক্রেতাদের অভিযোগ, লাখ টাকার গরুর চামড়াও আকারভেদে মাত্র ৪০০ থেকে ৬০০ টাকায় বিক্রি করতে হয়েছে। অন্যদিকে ছাগল, বকরি ও ভেড়ার চামড়ার ক্রেতা না থাকায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ চামড়া অবিক্রীত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, সরকার নির্ধারিত দামে কেনাবেচা নিশ্চিত হলে বাজারে কিছুটা স্বস্তি ফিরতে পারত। কিন্তু বাস্তবে অধিকাংশ স্থানে গরুর চামড়ার দাম প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
ছোট পশুর চামড়ার বাজারে পরিস্থিতি ছিল আরও নাজুক। গত বছর প্রায় মূল্যহীন হয়ে পড়া ছাগলের চামড়া এবার ১০ থেকে ৩০ টাকায় বিক্রি হলেও অনেক এলাকায় কোনো ক্রেতার দেখা মেলেনি। ফলে গরুর চামড়ার সঙ্গে কেনা ছাগল, বকরি ও ভেড়ার চামড়া বিক্রি করতে না পেরে লোকসানের মুখে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
ব্যবসায়ীদের মতে, পাইকারি বাজারে ছোট পশুর চামড়ার চাহিদা প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ পাইকারের আগ্রহ ছিল শুধু গরুর চামড়াকে ঘিরে। এতে ছোট পশুর চামড়া কিনে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।
চামড়া ব্যবসার সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা জানান, অদক্ষভাবে চামড়া ছাড়ানো এবং যথাযথ সংরক্ষণের অভাবে অনেক চামড়া নষ্ট হয়েছে। সময়মতো লবণ প্রয়োগ ও সঠিক প্রক্রিয়াজাতকরণ না হওয়ায় বাজারমূল্য হারিয়েছে বহু চামড়া।
এদিকে নগরীর বিভিন্ন এলাকায় অবিক্রীত চামড়া ফেলে রাখায় পরিচ্ছন্নতা কর্মীদের অতিরিক্ত চাপ সামলাতে হয়েছে। বগুড়া সিটি করপোরেশনের কর্মীরা জানান, শহরের বিভিন্ন স্থান থেকে বিপুল পরিমাণ ছাগল, বকরি ও ভেড়ার চামড়া অপসারণ করতে হয়েছে। শুধু ৪ নম্বর ওয়ার্ড সংলগ্ন এলাকা থেকেই প্রায় ১০ হাজার পিস ছোট পশুর চামড়া সংগ্রহ করে নির্ধারিত স্থানে ফেলা হয়েছে।
ধুনট উপজেলার কালেরপাড়া ইউনিয়নের বাসিন্দা আইয়ুব আলী বলেন, “১ লাখ ৪৬ হাজার টাকা দামের একটি গরুর চামড়া বিক্রি করেছি মাত্র ৬০০ টাকায়। ক্রেতাও কম, দামও আশানুরূপ নয়।”
সোনাতলা উপজেলার শাহাদত হোসেন জানান, “ছাগলের চামড়া ১০ থেকে ২০ টাকায় বিক্রি হলেও বকরি ও ভেড়ার চামড়া কেউ কিনতে চায়নি। গরুর চামড়ার দামও অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যাশার তুলনায় কম ছিল।”
জেলার চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি, ঢাকার ট্যানারি মালিকদের কাছে তাদের প্রায় ৩২ কোটি টাকার বকেয়া দীর্ঘদিন ধরে আটকে রয়েছে। এতে ব্যবসায়ীরা আর্থিক সংকটে পড়েছেন। পাশাপাশি সংরক্ষণ, পরিবহন, শ্রমিক মজুরি ও প্রক্রিয়াজাতকরণের খরচও বেড়েছে।
চামড়া ব্যবসায়ী মাফুজার রহমান মাফু বলেন, “গত বছরের তুলনায় এবার চামড়ার সরবরাহ প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে। প্রায় ৬ কোটি টাকার চামড়া কেনার লক্ষ্য থাকলেও তা পূরণ হয়নি। গরুর চামড়ার দাম কিছুটা বেড়েছে, কিন্তু বকরি ও ভেড়ার চামড়ার কোনো বাজার নেই। পরিবহন, শ্রমিক ও লবণের খরচ বাড়ায় লাভের বদলে লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, চামড়া খাতকে টিকিয়ে রাখতে শুধু গরুর চামড়া নয়, ছোট পশুর চামড়ারও টেকসই বাজার তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারি নজরদারি বৃদ্ধি, সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং বিপণন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করা জরুরি। তা না হলে প্রতিবছরই বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
