
রিপন দাস: উত্তরাঞ্চলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় সোলার পাওয়ারচালিত সেচ পাম্পে কৃষকের সেচ খরচ কমার পাশাপাশি বাড়ছে ফসল উৎপাদনের সুযোগ। প্রতি বিঘা জমিতে প্রতি মৌসুমে গড়ে ৭৫ লিটার ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে, যার মূল্য প্রায় ৯ হাজার ৫০০ টাকা। একই সঙ্গে বসতবাড়ির বিদ্যুৎ বিল কমছে প্রায় ৪৫ শতাংশ। আর ১৫ বিঘা জমিতে সারা বছর সেচ দিতে সক্ষম একটি সোলার পাম্প বছরে প্রায় দেড় মেট্রিক টন কার্বন নিঃসরণ কমাতে পারে।
দেশের ১৪ জেলার ৬০টি উপজেলায় বাস্তবায়নাধীন ডাইভারসিফাইড রেজিলিয়েন্ট এগ্রিকালচার ফর ইমপ্রুভড ফুড অ্যান্ড নিউট্রিশন সিকিউরিটি অব স্মলহোল্ডার এগ্রিকালচারাল কম্পিটিটিভনেস (এসএসিপি-রেইনস) প্রকল্পের প্রাথমিক মূল্যায়নে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রকল্প পরিচালক ড. মুহাম্মাদ এমদাদুল হক জানান, সূর্যালোক থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে ১৪ জেলার ৬০টি উপজেলায় ১ হাজার ৯০০ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০২৪ সালে শুরু হওয়া প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ২৪০টি পাম্প স্থাপনের কাজ শেষ হয়েছে। আরও ১৮টি পাম্প স্থাপনের কাজ আগামী বছরের মাঝামাঝি শেষ হবে।
তিনি বলেন, ১৫ বিঘা জমিতে সারা বছর সেচ দেওয়ার সক্ষমতাসম্পন্ন একটি সোলার পাম্প বছরে প্রায় দেড় মেট্রিক টন কার্বন নিঃসরণ কমায়।
প্রকল্প পরিচালক আরও বলেন, “প্রকল্পভুক্ত ২৫৮টি সেচযন্ত্র বছরে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা মূল্যের ১ লাখ ২৬ হাজার লিটার ডিজেল সাশ্রয় করবে। একই সঙ্গে বসতবাড়ির বিদ্যুৎ বিল সাশ্রয় হবে বছরে ২৪ লাখ টাকা।”
প্রকল্পের জুনিয়র মনিটরিং অ্যান্ড রিপোর্টিং স্পেশালিস্ট (জেএমআরএস) মো: আতিকুল ইসলাম বিপ্লব জানান, ১৫ বিঘা জমিতে সেচ দেওয়ার পাশাপাশি গৃহস্থালি কাজে সারা বছর পানি সরবরাহ করতে সক্ষম একটি সোলার পাম্প স্থাপনে সর্বোচ্চ প্রায় ৬ লাখ টাকা খরচ হয়।
তিনি বলেন, “রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই একটি পাম্প কমপক্ষে ১০ বছর চলতে পারে। আর একটু যত্ন নিলে একটি পাম্প ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত চলতে পারে।”
বগুড়ায় প্রকল্পের আওতায় ১৯টি ইউনিট স্থাপন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে মোকামতলা, সারিয়াকান্দি ও ধুনটসহ কয়েকটি এলাকায় পাম্পগুলো দিয়ে সেচ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এসব পাম্প কৃষিজমিতে সেচ দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মুসল্লিদের অজু ও সুপেয় পানির চাহিদাও পূরণ করছে।
বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলার নারচী ইউনিয়নের গোদাগাড়ী গ্রামের কৃষক কোহিনুর বেগম জানান, সোলার সেচের সুবিধা পাওয়ার আগে গ্রামে বছরে একটি ফসলের বেশি উৎপাদন করা কঠিন ছিল। আউশ ধান চাষের সুযোগও ছিল না।
কোহিনুর বেগম বলেন, “আমার যেটুকু জমি আছে, তা চাষ করতে হতো ডিজেলচালিত মেশিনে। এ কারণে প্রতি বিঘায় শুধু সেচের পেছনেই অনেক টাকা খরচ হতো। আর বাড়ির বিদ্যুৎ বিল আসত ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা। এখন সেচ ও বসতবাড়ির কোনো বিদ্যুৎ বিল দিতে হয় না।”
তিনি জানান, এবারই প্রথম এক বিঘা জমিতে আউশ ধান চাষ করেছেন। ধান ও খড় বিক্রি করে লাভ হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা। ধান বিক্রি করে ১২ হাজার এবং খড় বিক্রি করে পেয়েছেন ২ হাজার টাকা।
শুধু নিজের জমি নয়, আশপাশের কৃষকরাও এ সুবিধা পাচ্ছেন। কোহিনুর বলেন, “কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী আমার জমির আশপাশের অন্য ব্যক্তিদের জমিতেও বিনা খরচে সেচ দিচ্ছি।”
গাইবান্ধার সাঘাটা উপজেলার কৃষক মো: আহসান হাবিব প্রায় দুই মাস আগে সোলার পাম্পের সুবিধা পেয়েছেন।
তিনি জানান, নিজের পাশাপাশি গ্রামের অন্য কৃষকরাও এ পাম্পের সুবিধা নিচ্ছেন।
আহসান হাবিব আরএ বলেন, “এ সুবিধা পাওয়ার পর আমার আর কোনো সেচ খরচ নেই। অথচ একসময় বোরো ধানে সেচ দিতে কমপক্ষে ২ হাজার ৫০০ টাকা খরচ হতো। বাসার বিদ্যুৎ বিলও এখন অর্ধেক হয়েছে।”
তিনি জানান, সোলার পাম্পের পানি কৃষিকাজের পাশাপাশি গৃহস্থালি কাজেও ব্যবহার করা যাচ্ছে।
এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক ড. মুহাম্মাদ এমদাদুল হক জানান, সোলারনির্ভর সেচযন্ত্র ব্যবহারে গড়ে ৮৫ শতাংশ ডিজেল সাশ্রয় হচ্ছে। বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের হার প্রায় ৭০ শতাংশ। আর বসতবাড়ির বিদ্যুৎ বিল কমছে প্রায় ৪৫ শতাংশ।
প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সোলারচালিত সেচব্যবস্থা কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানোর পাশাপাশি অনাবাদি জমিতে নতুন করে ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি করছে। একই সঙ্গে ডিজেলের ব্যবহার কমায় কমছে কার্বন নিঃসরণ। ফলে কৃষিতে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি পরিবেশ সুরক্ষাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে এ প্রযুক্তি।



