
বাংলাদেশের প্রায় ৯৮ শতাংশ মানুষ রোজা রাখে। ফলে রোজা থাকা অবস্থায় ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তে শর্করার মাত্রা হঠাৎ বেড়ে যাওয়া বা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে বয়স্কদের মধ্যে ডায়াবেটিসের হার ১২ থেকে ১৩ শতাংশ হওয়ায় বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। অনেকেই রোজা রেখে ডায়াবেটিস পরিমাপ করতে অনিচ্ছুক থাকেন, যার ফলে পরিস্থিতি জটিল হয়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে হয়।
এ কারণে ইফতারির আগে ও পরে নিয়মিত ডায়াবেটিস পরীক্ষা, সুষম খাদ্য গ্রহণ এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময়মতো ওষুধ গ্রহণের ওপর জোর দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে রোজা রেখে ডায়াবেটিস মাপলে বা ইনসুলিন নিলে রোজার কোনো ক্ষতি হয় না-এ বিষয়টি মসজিদের খুতবায় আরও বেশি করে আলোচনার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
গতকাল দৈনিক ইত্তেফাকের মাজেদা বেগম মিলনায়তনে আয়োজিত ‘ডায়াবেটিস রোগীদের নিরাপদে রোজা পালনে করণীয়’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের সহযোগিতায় অনুষ্ঠানটির আয়োজন করে বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটি (বিইএস) ও দৈনিক ইত্তেফাক। আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান প্রতিবেদক শামসুদ্দীন আহমেদ।
রোজার আগে ঝুঁকি নিরূপণের গুরুত্ব
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সভাপতি ও বারডেম এন্ডোক্রাইনোলজি বিভাগের প্রধান সহযোগী অধ্যাপক ডা. ফারিয়া আফসানা বলেন, রমজান আত্মশুদ্ধির মাস, এ সময় ডায়াবেটিস রোগীরাও সুস্থভাবে রোজা রাখতে চান। আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশনের নির্দেশনা অনুযায়ী রোজার আগেই রোগীর ঝুঁকি নিরূপণ জরুরি।
তিনি জানান, যাদের সাম্প্রতিক সময়ে হাইপোগ্লাইসেমিয়া হয়েছে, হার্ট বা চোখের সমস্যা রয়েছে, গর্ভবতী বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন, কিংবা টাইপ-১ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত-তাদের জন্য রোজা রাখা উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ। তবে ক্লোজ মনিটরিংয়ের মাধ্যমে কেউ কেউ রোজা রাখতে পারেন।
ওষুধ ও ইনসুলিন ব্যবস্থাপনা
বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সাধারণ সম্পাদক ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. এম সাইফুদ্দীন বলেন, রোজা শুরুর অন্তত তিন মাস আগে রোগীর ঝুঁকি নিরূপণ করা উচিত। রোগীর বিএমআই, কোমরবিডিটি ও এইচবিএ-১সি পরীক্ষার মাধ্যমে ডায়াবেটিসের অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়।
বিএসএমএমইউ-এর এন্ডোক্রাইনোলজির সহযোগী অধ্যাপক ডা. শাহজাদা সেলিম বলেন, রোজার সময় নতুন ওষুধ যোগ না করে বিদ্যমান ওষুধের ডোজ সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ। সকালের ওষুধ ইফতারে এবং রাতের ওষুধ সেহরিতে নেওয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
ইউনাইটেড হাসপাতালের সিনিয়র কনসালট্যান্ট অধ্যাপক মুহাম্মদ হাফিজুর রহমান বলেন, রোজায় সাধারণত ইনসুলিনের মাত্রা কমিয়ে দেওয়া হয়। সকালের ইনসুলিন ইফতারে এবং রাতের ইনসুলিন সেহরিতে গ্রহণ নিরাপদ।
নিয়মিত পরীক্ষা ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণের তাগিদ
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মির্জা শরীফুজ্জামান বলেন, রোজার সময় ইফতারির আগে (বিকেল ৪-৫টার মধ্যে) এবং ইফতারির পরে ডায়াবেটিস মাপা জরুরি। উচ্চ ঝুঁকির রোগীদের দিনে একাধিকবার পরীক্ষা প্রয়োজন হতে পারে।
ডা. আফসার আহমেদ বলেন, দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার কারণে ইফতারে ভাজাপোড়া ও অতিরিক্ত খাবার এড়িয়ে বৈজ্ঞানিক ও সুষম খাদ্য গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব হেলথ সায়েন্সেসের সহযোগী অধ্যাপক ডা. আহমেদ সালাম মীর বলেন, রোজায় হঠাৎ শর্করা কমে গেলে অনেকেই তা বুঝতে পারেন না। তাই কম ঝুঁকির রোগীদেরও সপ্তাহে অন্তত দুই–তিনবার ডায়াবেটিস পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
রোজা রেখে ডায়াবেটিস পরীক্ষা-ধর্মীয় অনুমোদন রয়েছে
বক্তারা জানান, বায়তুল মোকাররমের ইমামসহ ধর্মীয়ভাবে ফতোয়া রয়েছে-রোজা রেখে ডায়াবেটিস মাপা বা ইনসুলিন নেওয়ায় রোজার কোনো ক্ষতি হয় না।
ওষুধ সরবরাহে বিকনের অঙ্গীকার
বিকন ফার্মাসিউটিক্যালসের ক্রনিক কেয়ার ডিভিশনের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট শেখ মো. ফয়সাল হাবীব বলেন, আন্তর্জাতিক প্রটোকল মেনে তৈরি ওষুধের নিরবিচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকন নিয়মিত বাজার মনিটরিং করছে। রমজান মাসে ডায়াবেটিস রোগীদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপদ ওষুধ সারা দেশে সরবরাহ অব্যাহত থাকবে।



