আইন ও অপরাধ
প্রধান খবর

অংশীদারি চুক্তিতে প্রতারণা-বিশ্বাসভঙ্গ হলে ফৌজদারি মামলা চলবে

ব্যবসায়িক লেনদেন বা অংশীদারি চুক্তির সুযোগ নিয়ে অসৎ উদ্দেশ্যে প্রতারণা, অর্থ আত্মসাৎ ও বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগ থাকলে সেটিকে শুধু ‘দেওয়ানি বিরোধ’ বলে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। এমন ঘটনায় দেওয়ানি মামলার পাশাপাশি ফৌজদারি বিচারও স্বাধীনভাবে চলতে পারে বলে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট।

রোববার (২৩ আগস্ট) মো. শাহ আলম বনাম রাষ্ট্র ও অন্যান্য মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে এ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন হাইকোর্ট। এর আগে গত ২৬ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি মো. বজলুর রহমান ও বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়েরের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। ১৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায়টি লিখেছেন বিচারপতি সৈয়দ হাসান জুবায়ের।

মামলার বিবরণ অনুযায়ী, রাজধানীর মিরপুর রোডে গাউছিয়া মার্কেটে একটি দোকানের মালিক ছিলেন শাহ আলম। অংশীদারি লভ্যাংশ দেওয়ার শর্তে ওই দোকানে কাপড়ের ব্যবসা শুরু করেন মো. জাহিদ খান।

পরবর্তীতে ২০১২ সালে শাহ আলম দোকানটি ১ কোটি ৭ লাখ টাকা মূল্যে জাহিদ খানের কাছে বিক্রির বিষয়ে সমঝোতা করেন। এর অংশ হিসেবে জাহিদ খান বিভিন্ন সময়ে মোট ৮৬ লাখ টাকা পরিশোধ করেন বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে পরে শাহ আলম দোকানটি রেজিস্ট্রি করে দিতে টালবাহানা শুরু করেন বলে অভিযোগ ওঠে। বিষয়টি দোকান মালিক সমিতিতে সালিশে উঠলে জাহিদ খানের পাওনা পরিশোধের সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু শাহ আলম সম্পূর্ণ টাকা পাওয়ার বিষয়টি এবং চুক্তির অস্তিত্ব অস্বীকার করেন। পাশাপাশি জাহিদ খানকে প্রাণনাশের হুমকি ও চাঁদা দাবির অভিযোগও আনা হয়।

এরপর ২০২৩ সালে জাহিদ খান ঢাকার সিএমএম আদালতে দণ্ডবিধির ৩৮৫, ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় শাহ আলমের বিরুদ্ধে সিআর মামলা করেন।

প্রাথমিক তদন্ত ও শুনানি শেষে একই বছর শাহ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরুর নির্দেশ দেন ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত।

পরে শাহ আলম ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারায় হাইকোর্টে আবেদন করে অভিযোগ গঠনের আদেশ স্থগিত ও মামলা বাতিলের দাবি জানান। তার যুক্তি ছিল, ব্যবসায়িক হিসাব বা অংশীদারি চুক্তি ভঙ্গের বিষয় মূলত দেওয়ানি বিরোধ; এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি আইনে প্রতারণা বা বিশ্বাসভঙ্গের অভিযোগে বিচার চলতে পারে না।

জাহিদ খানের আইনজীবী মো. নিয়াজ মোর্শেদ শুনানিতে যুক্তি দেন, অংশীদারি চুক্তির শুরু থেকেই অসৎ উদ্দেশ্যে অর্থ গ্রহণ এবং পরে তা আত্মসাৎ করা হলে তা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে। দেওয়ানি আদালতে প্রতিকারের সুযোগ থাকলেও একই ঘটনায় ফৌজদারি বিচার চলতে কোনো আইনি বাধা নেই বলেও তিনি দাবি করেন।

হাইকোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৬১এ ধারায় মামলা বাতিলের আবেদন বিবেচনার সময় আদালত মূলত নালিশি দরখাস্তে থাকা অভিযোগগুলো বিবেচনা করেন।

আদালত বলেন, এই মামলায় অংশীদারি চুক্তির শুরুতেই প্রতারণা, অসাধু উদ্দেশ্য এবং পরবর্তী সময়ে অর্থ আত্মসাতের নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। ফলে এটিকে কেবল দেওয়ানি বিরোধ হিসেবে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

শাহ আলম প্রকৃতপক্ষে দোকানের মালিক ছিলেন কি না বা তিনি অর্থ গ্রহণ করেছিলেন কি না-এসব বিষয় তর্কিত এবং বিচারিক আদালতে সাক্ষ্যপ্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে বলে উল্লেখ করেন হাইকোর্ট।

আদালতের মতে, এ পর্যায়ে এসব বিষয়ে হাইকোর্টের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। অধস্তন আদালতে শাহ আলমের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী অভিযোগ গঠন করা হয়েছে, যা তাকে বিচারের মুখোমুখি করার জন্য যথেষ্ট।

হাইকোর্ট আরও বলেন, দেওয়ানি বিরোধের অজুহাতে এই মামলার বিচারিক কার্যক্রম স্থগিত রাখা যাবে না।

চূড়ান্ত আদেশে হাইকোর্ট শাহ আলমের আবেদন খারিজ করে আগে জারি করা রুল খারিজ করেন। একই সঙ্গে রুল জারির সময় দেওয়া অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার ও বাতিল করা হয়।

এ ছাড়া অধস্তন আদালতে চলমান মামলার বিচার কার্যক্রম দ্রুত ও আইন অনুযায়ী সম্পন্ন করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট।

তথ্যসূত্র: বাংলা ট্রিবিউন

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button