জাতীয়
প্রধান খবর

কোন পদ্ধতিতে হবে সংসদের উচ্চকক্ষ?

প্রাপ্ত মোট ভোট-না আসন

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় এখন সবচেয়ে আলোচনায় জাতীয় সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন। যদিও উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠার বিষয়ে নির্বাচিত সব রাজনৈতিক দল একমত, তবে কোন পদ্ধতিতে আসন বণ্টন হবে তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট সিদ্ধান্ত হয়নি।

গণভোটের রায় অনুযায়ী, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারিত হবে। তবে সরকার গঠন করতে যাওয়া বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র নির্বাচনি ইশতেহারে উল্লেখ ছিল-সংসদে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হবে। এ বিষয়ে দলটি প্রকাশ্যে কিছু না বললেও সূত্র জানায়, তারা ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে আগ্রহী।

বিশ্লেষকদের মতে, এক্ষেত্রে গণভোটের রায় সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে, কারণ জনগণ সুনির্দিষ্টভাবে এ বিষয়ে মত দিয়েছে।

ভোটভিত্তিক বনাম আসনভিত্তিক বণ্টন

প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে আসন বণ্টন হলে-

  • বিএনপি পাবে ৪৮টি আসন
  • বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাবে ৩৩টি আসন

অন্যদিকে নিম্নকক্ষের প্রাপ্ত আসনের ভিত্তিতে বণ্টন হলে-

  • বিএনপি পাবে ৬৯টি আসন
  • জামায়াতে ইসলামী পাবে ২২টি আসন

বিষয়টি চূড়ান্ত হতে কমপক্ষে ৮ মাস সময় লাগতে পারে। কারণ ত্রয়োদশ সংসদ কার্যকর হওয়ার পর প্রথম ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংসদ সদস্যরা সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে এ সংক্রান্ত বিধিবিধান প্রণয়ন করবেন।

প্রেক্ষাপট: দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদের প্রস্তাব

বর্তমানে জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সদস্যের সংখ্যা ৩০০। ‘জুলাই সনদ’ অনুসারে রাষ্ট্রের আইনসভায় ক্ষমতার ভারসাম্য আনতে দুইকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের প্রস্তাব করা হয়-নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষ নামে। নির্বাচিত ৩০০ সদস্যের নিম্নকক্ষের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব করা হয়।

রাজনৈতিক দলগুলো এ সংক্রান্ত জুলাই সনদে স্বাক্ষর করলে তা গণভোটে দেয় সরকার। গণভোটের প্রশ্নপত্রে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল-রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের ভিত্তিতে সংসদের উচ্চকক্ষের প্রতিনিধির সংখ্যা নির্ধারিত হবে।

এ প্রসঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (জুলাই সনদসংক্রান্ত) মনির হায়দার বলেন, একটি দলের ইশতেহারে নানা বিষয় থাকতে পারে, কিন্তু গণভোটে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল। ফলে এর আইনগত ভিত্তি রয়েছে। তিনি আরও বলেন, দলগুলোর শীর্ষ নেতারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার করেছেন। সুতরাং এটি শুধু সরকারের নয়, রাষ্ট্র ও সব রাজনৈতিক দলের এজেন্ডা।

বিশেষজ্ঞ মত

জাতীয় ঐকমত্য কমিশন-এর সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, গণভোটে যে প্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়েছে তার ভিত্তিতেই জনরায় এসেছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দেশ পরিচালনা ও সংবিধান সংস্কারের ক্ষেত্রে জনগণের প্রত্যাশা বিবেচনায় নেওয়া হবে। শনিবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলা হয়।

কোন দল কত আসন পেতে পারে

নির্বাচন কমিশন এখনো রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের চূড়ান্ত সংখ্যা প্রকাশ করেনি। তবে বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্যমতে-

ভোটভিত্তিক বণ্টনে (১০০ আসন):

  • বিএনপি: ৪৮
  • জামায়াতে ইসলামী: ৩৩
  • জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও ১১ দলীয় জোটের শরিকরা: ৯
  • অন্যান্য দল: অবশিষ্ট আসন

আসনভিত্তিক বণ্টনে (নিম্নকক্ষের ফল অনুযায়ী):

  • বিএনপি (২০৯ আসন পাওয়ায়): ৬৯
  • জামায়াতে ইসলামী (৬৮ আসন): ২২
  • জাতীয় নাগরিক পার্টি (৬ আসন): ২
  • অন্যান্য দল মিলিয়ে: ৭

উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার যোগ্যতা

জুলাই সনদের ২০ ধারায় বলা হয়েছে, নিম্নকক্ষের সদস্যদের জন্য সংবিধানে যে যোগ্যতা-অযোগ্যতার বিধান রয়েছে, উচ্চকক্ষেও সেটি কার্যকর হবে।

শর্তগুলো হলো-

  • বাংলাদেশের নাগরিক হতে হবে
  • ন্যূনতম বয়স ২৫ বছর
  • ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে ঋণখেলাপি হওয়া যাবে না
  • ফৌজদারি অপরাধে ২ বছরের বেশি দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়া যাবে না

অর্থাৎ সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক দল যাকে মনোনয়ন দেবে, তিনি উচ্চকক্ষের সদস্য হতে পারবেন। এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীরাও সুযোগ পেতে পারেন। তবে এ বিষয়ে বিস্তারিত আইন ও বিধি প্রণয়ন করা হবে।

উচ্চকক্ষের কাজ ও ক্ষমতা

গণভোটের রায় অনুযায়ী-

  • সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠের অনুমতি লাগবে
  • রাষ্ট্রপতির অভিসংশনে দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন প্রয়োজন
  • সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে
  • তবে সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারবে না
  • সাধারণ বিলে ভোটাধিকার থাকবে না

কবে গঠিত হবে উচ্চকক্ষ

জুলাই আদেশ অনুসারে নতুন এমপিরা শপথ গ্রহণের পর প্রথম ১৮০ কার্যদিবস সংবিধান সংস্কার পরিষদ হিসেবে কাজ করবেন। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।

আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি সংসদ সদস্যরা শপথ নেবেন। সে হিসাবে আগামী আট মাসের আগে উচ্চকক্ষ গঠনের সম্ভাবনা নেই। নিম্নকক্ষের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিনই উচ্চকক্ষের মেয়াদও শেষ হবে।

উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি চূড়ান্ত না হলেও, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হওয়ায় দেশের রাজনৈতিক কাঠামোতে বড় পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে-এ বিষয়ে এখন আর কোনো সংশয় নেই।

তথ্যসূত্র:

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button