সঞ্চয়পত্র বিক্রিতে রেকর্ড

চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) ৫৫ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। এই অঙ্ক গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে ৬১ শতাংশ বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই ছয় মাসে এতো বেশি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়নি।
গত ২০১৯-২০ অর্থবছরের সব মিলিয়ে জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে ৩৪ হাজার ২১১ কোটি ৩৪ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল। পুরো অর্থবছরে (জুলাই-জুন) বিক্রি হয়েছিল ৬৭ হাজার ১২৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকা।
এ হিসাবে দেখা যাচ্ছে, গত অর্থবছরে মোট যতো টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছিল তার ৮২ শতাংশ ছয় মাসেই বিক্রি হয়ে গেছে।
সঞ্চয়পত্র বিক্রির এই উল্লম্ফন অব্যাহত থাকলে চলতি অর্থবছর শেষে মোট বিক্রির পরিমাণ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানিয়েছেন অর্থনীতির গবেষক বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক আহসান এইচ মনসুর।
তিনি বলেন, “মহামারিকালে সঞ্চয়পত্র বিক্রি বাড়াটাকে ‘অস্বাভাবিক’ লাগছে আমার কাছে।”
তবে এর দুটি সম্ভাব্য কারণ থাকতে পারে বলে মনে করেন তিনি। আহসান মনসুরের কথায়, “প্রথমত প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটি অংশ দিয়ে মানুষ সঞ্চয়পত্র কিনছে। আগেও কিনত, তবে এখন রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় এই অঙ্ক বেড়েছে। এছাড়া অন্য যে কোনো সঞ্চয় প্রকল্পের চেয়ে সঞ্চয়পত্রের সুদের হার যেহেতু বেশি, সবাই এখানেই বিনিয়োগ করছে। ব্যাংকে ডিপিএস খুললে ৬ শতাংশের বেশি সুদ পাওয়া যায় না। সেখানে সঞ্চয়পত্র কিনলে ১১ সাড়ে ১১ শতাংশ পর্যন্ত মুনাফা পাওয়া যায়। ব্যাংকে টাকা রাখা ঝুঁকিও মনে করেন অনেকে। তাই নিরাপদ ভেবে সবাই সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করতে পারে।”
আহসান মনসুর বলেন, “ছয় মাসে ৫৫ হাজার কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। বাকি ছয় মাসেও যদি এভাবে বিক্রি বাড়ে, তাহলে বছর শেষে মোট বিক্রি এক লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে।”
পিআরআইয়ের নির্বাহী পরিচালক উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “সঞ্চয়পত্র বিক্রি বেড়ে যাওয়ায় সরকারের ভবিষ্যত ঋণের বোঝা বেড়ে যাবে।”
সঞ্চয়পত্র বিক্রির ক্ষেত্রে সরকার এখন জাতীয় পরিচয়পত্র এবং টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করেছে। তাছাড়া ব্যাংক হিসাব ছাড়া সঞ্চয়পত্র কেনা যায় না।
ব্যাংকগুলোর আমানতের সুদের হার কম এবং পুঁজিবাজারে দীর্ঘ মন্দার কারণে গত কয়েক বছর ধরে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছিল সঞ্চয়পত্র বিক্রি। এতে সরকারের ঋণের বোঝাও অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছিল।
বিক্রির চাপ কমাতে ২০১৯ সালের ১ জুলাই থেকে সঞ্চয়পত্রে মুনাফার উপর উৎসে করের হার ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। একই সঙ্গে এক লাখ টাকার বেশি সঞ্চয়পত্র কিনতে টিআইএন (কর শনাক্তকরণ নম্বর) বাধ্যতামূলক করা হয়। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট না থাকলে সঞ্চয়পত্র বিক্রি না করার শর্ত আরোপসহ আরও কিছু কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ফলে কমতে শুরু করে সঞ্চয়পত্রের বিক্রি।
জাতীয় সঞ্চয় অধিদপ্তরের তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯-২০ অর্থবছরে ৬৭ হাজার ১২৭ কোটি ৭৫ লাখ টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়। এর মধ্যে আগে বিক্রি হওয়া সঞ্চয়পত্রের সুদ-আসল বাবদ ৫২ হাজার ৬৯৯ কোটি ৪০ লাখ টাকা শোধ করা হয়। এ হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ দাঁড়ায় ১৪ হাজার ৪২৮ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
২০১৮-১৯ অর্থবছরে সঞ্চয়পত্রের মোট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৯০ হাজার ৩৪২ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। যা ছিল এ যাবতকালে এক অর্থবছরে সবচেয়ে বেশি বিক্রি। ওই বছরে সুদ আসল বাবদ বিনিয়োগকারীদের শোধ করা হয় ৪০ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। নিট বিক্রির পরিমাণ ছিল ৪৯ হাজার ৯৩৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা।
২০২০-২১অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে মোট ৫৪ হাজার ৯৭৬ কোটি ১৯ লাখ সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়েছে। সুদ-আসল বাবদ গ্রাহকদের শোধ করা হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা। এ হিসাবে নিট বিক্রির পরিমাণ হচ্ছে ২০ হাজার ৪৮৭ কোটি ১২ লাখ টাকা।
চলতি অর্থবছরের বাজেটে বাজেট ঘাটতি মেটাতে সরকার সঞ্চয়পত্র থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্য ধরেছিল। কিন্তু ছয় মাসেই তার চেয়ে বেশি ঋণ নিয়ে ফেলেছে সরকার।