
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির ‘দুর্গ’ হিসেবে পরিচিত বগুড়ার অন্তত তিনটি আসনে জামায়াতে ইসলামীর শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়েছে বিএনপি। দলের প্রতিষ্ঠাতা সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নিজ জেলা হওয়ায় ধানের শীষের ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে দুর্গ ধরে রাখতে চায় বিএনপি। তবে জামায়াতে ইসলামী বগুড়াকে কোনো দলের একক দুর্গ মানতে নারাজ। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী জনআকাঙ্ক্ষাকে সামনে রেখে তারা এখানে বিজয়ের প্রত্যাশা করছে।
দলীয় সূত্র জানায়, এবারের নির্বাচনে বগুড়ার সাতটি আসনেই বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর মধ্যে বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ), বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি) এবং বগুড়া-৪ (কাহালু ও নন্দীগ্রাম) আসনে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ): ধানের শীষ বনাম দাঁড়িপাল্লা
শিবগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-২ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৪২ হাজার ১৫৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭১ হাজার ৪৯৭ এবং নারী ভোটার ১ লাখ ৭০ হাজার ৬৫৩ জন, হিজরা ৫ জন। ভোটকেন্দ্র রয়েছে ১১৪টি।
১৯৯১ সালে এ আসনে জামায়াতে ইসলামীর আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। ২০১৮ সালে বিএনপি আসনটি নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নাকে ছেড়ে দিলেও তিনি জাতীয় পার্টির প্রার্থী শরিফুল ইসলামের কাছে পরাজিত হন।
এবার এ আসনে বিএনপির মীর শাহে আলম (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান (দাঁড়িপাল্লা), নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না (কেটলি), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জামাল উদ্দিন (হাতপাখা), গণ অধিকার পরিষদের সেলিম সরকার (ট্রাক), জাতীয় পার্টির শরিফুল ইসলাম (লাঙ্গল) এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী রেজাউল করিম (সিঁড়ি) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
স্থানীয় ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মাঠে সক্রিয় থাকলেও মূল লড়াই হবে ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে। সম্প্রতি শিবগঞ্জের মোকামতলা বন্দরে আয়োজিত পথসভায় বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান ধানের শীষে ভোট দিয়ে মীর শাহে আলমকে বিজয়ী করার আহ্বান জানান। অপরদিকে একই এলাকায় আয়োজিত পথসভা থেকে জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্না নির্বাচনী এলাকায় ১০-১২ দিন প্রচারণা চালিয়েছেন। তিনি অভিযোগ করেন, ধানের শীষের প্রার্থীর পক্ষ থেকে তাঁর প্রচারণায় বাধা ও কর্মী-সমর্থকদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে।
বিএনপির প্রার্থী মীর শাহে আলম বলেন, ‘ধানের শীষে ভোটবিপ্লবের মাধ্যমে শিবগঞ্জের মানুষ আবারও প্রমাণ করবে-এটি বিএনপির শক্ত ঘাঁটি।’
জামায়াতের প্রার্থী আবুল আজাদ মোহাম্মদ শাহাদুজ্জামান বলেন, ‘মানুষ জেগেছে। জামায়াতের নেতৃত্বাধীন জোটের প্রতি ভোটারদের আস্থা বাড়ছে। আসনটি পুনরুদ্ধার হবে।’
বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি): ঐতিহ্যের মুখে পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ
দুপচাঁচিয়া ও আদমদীঘি উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-৩ আসনে মোট ভোটার ৩ লাখ ৩৯ হাজার ১৭৩ জন। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৬৯ হাজার ৮২৩ এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৪৭ জন, হিজরা ৩জন। ভোটকেন্দ্র ১১৮টি।
১৯৯১ সাল থেকে এ আসনে অনুষ্ঠিত চারটি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে জয় পেয়েছে বিএনপি। এবার এখানে বিএনপির আবদুল মহিত তালুকদার (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর নূর মোহাম্মদ আবু তাহের (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের শাহজাহান আলী তালুকদার (হাতপাখা) ও জাতীয় পার্টির শাহিনুল ইসলাম (লাঙ্গল) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
স্থানীয় ব্যবসায়ী মামুন হোসেন বলেন, বিএনপির প্রার্থীর পারিবারিক ঐতিহ্য ও জনপ্রিয়তা রয়েছে। অন্যদিকে স্কুলশিক্ষক রশিদুল ইসলাম বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পর মানুষ জামায়াতের দিকে ঝুঁকছে।
ভোটার আবু রায়হান জানান, ভোটের দিন যত ঘনিয়ে আসছে, সংঘাতের আশঙ্কাও বাড়ছে। আরিফুল ইসলাম বলেন, ‘এখন বোঝা যাচ্ছে, ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার লড়াই হবে হাড্ডাহাড্ডি।’
বিএনপির প্রার্থী আবদুল মহিত তালুকদার বলেন, ‘পারিবারিক সুনাম ও ধানের শীষের জোয়ারে বিজয় সুনিশ্চিত।’
জামায়াতের প্রার্থী নূর মোহাম্মদ আবু তাহের বলেন, ‘ভোটবিপ্লবের মাধ্যমে নতুন ইতিহাস গড়া হবে।’
বগুড়া-৪ (কাহালু ও নন্দীগ্রাম): ধারাবাহিকতা না পরিবর্তন
কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলা নিয়ে গঠিত বগুড়া-৪ আসনে ভোটার সংখ্যা ৩ লাখ ৫৯ হাজার ৫২৩। এর মধ্যে নারী ভোটার ১ লাখ ৮০ হাজার ৫৩০ এবং পুরুষ ভোটার ১ লাখ ৭৮ হাজার ৯৮৫ জন, হিজরা ৮ জন। ভোটকেন্দ্র ১১৪টি।
১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত আসনটি বিএনপির দখলে ছিল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে এখানে জয় পান জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন।
এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন মোশারফ হোসেন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর মোস্তফা ফয়সাল (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের ইদ্রিস আলী (হাতপাখা) এবং জাতীয় পার্টির শাহীন মোস্তফা কামাল (লাঙ্গল)।
বিএনপির সমর্থকদের দাবি, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি ও উন্নয়ন কাজের কারণে মোশারফ হোসেন এগিয়ে। অন্যদিকে জামায়াতের সমর্থকেরা বলছেন, ভোটাররা পরিবর্তন চান এবং দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী উচ্চশিক্ষিত ও গ্রহণযোগ্য।
মোশারফ হোসেন বলেন, ‘ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও দলীয় শক্তি মিলিয়ে বিপুল ভোটে জয়ী হব।’
জামায়াতের প্রার্থী মোস্তফা ফয়সাল বলেন, ‘এবার কাহালু-নন্দীগ্রামের মানুষ দাঁড়িপাল্লায় সিল দিয়ে ব্যালটবিপ্লব ঘটাবেন।’



