
দেশের অন্তত পাঁচ জেলায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৩১ জন রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। পরিস্থিতি অনুসন্ধানে সেখানে দল পাঠিয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণাপ্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)।
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ ও মেহেরপুরের গাংনী উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ ছড়িয়েছে। এ ছাড়া রংপুরের পীরগাছা ও দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলায়ও আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। প্রায় দুই মাস আগে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলাতেও অ্যানথ্রাক্স দেখা দেয়। সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা, প্রাণিসম্পদ বিভাগ এবং আইইডিসিআর এসব তথ্য নিশ্চিত করেছে।
আইইডিসিআরের তথ্যানুযায়ী, অ্যানথ্রাক্স একটি প্রাণীবাহিত বা জুনোটিক রোগ। মাটিতে অ্যানথ্রাক্সের জীবাণু থাকে। ঘাস বা ঘাসজাতীয় খাবার খাওয়ার সময় গরু-মহিষের মতো তৃণভোজী প্রাণী এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। পরে আক্রান্ত গরু বা মহিষের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে অ্যানথ্রাক্স ছড়ায়।
আক্রান্ত গরু বা মহিষের মাংস নাড়াচাড়া করা কিংবা কাঁচা বা অর্ধসেদ্ধ মাংস খেলে মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে অ্যানথ্রাক্স মানুষ থেকে মানুষে ছড়ায় না।
মানুষের ত্বক, গলার ভেতর ও পাকস্থলীতে অ্যানথ্রাক্স হতে পারে। তবে ত্বকেই এ রোগ বেশি দেখা যায়। আক্রান্ত ব্যক্তির ত্বকে চুলকানিযুক্ত লাল ফুসকুড়ি দেখা দেয়, যা পরে ফোসকায় পরিণত হয়। দ্রুত রোগ শনাক্ত ও যথাসময়ে চিকিৎসা না হলে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ব্যক্তির মৃত্যু হতে পারে।
সুন্দরগঞ্জে বড় প্রাদুর্ভাব
মঙ্গলবার গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলা হাসপাতালে অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৩১ জন রোগী ভর্তি ছিলেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম জানান, প্রথমে সাতজন রোগী হাসপাতালে আসেন। পরে আরও ১৪ জন আসেন। সব মিলিয়ে বর্তমানে ৩১ জন রোগী ভর্তি রয়েছেন। রোগীর সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
মো. কামরুল ইসলাম জানান, গত ৯ সেপ্টেম্বর একটি বড় আকারের রুগ্ণ গরু জবাই করে ১০০ ভাগ করা হয়। ওই গরুর মাংস যেসব বাড়িতে গেছে, আক্রান্ত ব্যক্তিরাও মূলত সেসব বাড়ির।
হাসপাতালের চিকিৎসকেরা রোগীদের সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রেখেছেন।
উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা আরও জানান, আগস্ট মাসেও একই ধরনের ঘটনা ঘটে। সে সময় একটি রুগ্ণ গরু জবাই করে কয়েকজন মানুষ মাংস ভাগ করে নেন। পরে ৩০ আগস্ট অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ছয়জন হাসপাতালে ভর্তি হন।
গাংনীতে আক্রান্ত ৫৬ জন
মেহেরপুরের গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, আগস্ট মাসে এ উপজেলায় অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত ৩৮ জন শনাক্ত হন। সেপ্টেম্বরে আরও ১৮ জন শনাক্ত হয়েছেন। আক্রান্ত ব্যক্তিরা মূলত অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত রুগ্ণ ছাগলের মাংস কাটাকাটি বা নাড়াচাড়া করার কারণে আক্রান্ত হয়েছেন। তবে তাঁদের কাউকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়নি।
অন্যদিকে কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানান, প্রায় দুই মাস আগে উপজেলার দুটি গ্রামের অন্তত ১৫ জন মানুষ অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। তাঁদের প্রত্যেকেরই রুগ্ণ গরুর মাংসের সংস্পর্শে আসার ইতিহাস রয়েছে।
আইইডিসিআরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সুন্দরগঞ্জের ঘটনাটি বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব। তবে রংপুরের পীরগাছা ও দিনাজপুরের পার্বতীপুরের ঘটনাগুলো কিছুটা বিচ্ছিন্ন।
কারণ অনুসন্ধানে আইইডিসিআর
দেশের কোথাও কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে আইইডিসিআর সেখানে অনুসন্ধান দল পাঠায়। সংস্থাটি সুন্দরগঞ্জেও একটি অনুসন্ধান দল পাঠিয়েছে। ওই দল প্রাদুর্ভাবের কারণ জানার চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ পশুসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এ বছর রংপুরের একটি উপজেলা ও গাইবান্ধার একটি উপজেলার গবাদিপশুর মধ্যে অ্যানথ্রাক্সের সংক্রমণ দেখা গেছে।
১০০ শতাংশ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনার তাগিদ
অ্যানথ্রাক্স প্রতিরোধে দেশের ১০০ শতাংশ গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনার ওপর জোর দিয়েছেন আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকী।
তিনি বলেন, অ্যানথ্রাক্সে আক্রান্ত গরু-মহিষ বা অন্য কোনো পশুকে প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের বিধিমোতাবেক মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে। আক্রান্ত গবাদিপশু যেন কেউ জবাই বা বিক্রি করতে না পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনকে কঠোর ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে প্রাণিসম্পদ বিভাগের নজরদারি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
অধ্যাপক কাজী আহমেদ জাকীর মতে, গবাদিপশুকে টিকার আওতায় আনার দায়িত্ব প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের। আক্রান্ত পশু ব্যবস্থাপনায়ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে যথাযথ বিধি অনুসরণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো



