গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ডেনমার্কের চুক্তির ঘোষণা, কী কী থাকছে

গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত করে নেওয়ার হুমকি ঘিরে তৈরি হওয়া কূটনৈতিক বিরোধের অবসান ঘটিয়ে দ্বীপটির নিরাপত্তা নিয়ে একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ডেনমার্ক।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, এই চুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডের ‘নিরাপত্তা এবং অন্যান্য সব প্রয়োজনের ওপর স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ’ পাবে। অন্যদিকে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন বলেছেন, চুক্তিটি আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলের নিরাপত্তা জোরদার করবে।
তবে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে নির্দিষ্ট বিষয়গুলোর কথা বলেছেন, সেগুলো চুক্তিতে কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, সে বিষয়ে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী বিস্তারিত জানাননি।
গ্রিনল্যান্ডকে দখল বা অধিগ্রহণের বিষয়ে ট্রাম্পের কয়েক মাসের হুমকির পর এই চুক্তির ঘোষণা এলো। জাতীয় নিরাপত্তার উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে ট্রাম্প এর আগে বলেছিলেন, প্রতিরক্ষার দিক থেকে গ্রিনল্যান্ডের কৌশলগত অবস্থান এবং দ্বীপটির খনিজ সম্পদের কারণে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, এই চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘কোনো খরচ নেই’। তাঁর দাবি, এর মাধ্যমে গ্রিনল্যান্ডের নিরাপত্তা সুরক্ষিত ও প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্র পাবে।
তিনি আরও বলেন, চুক্তিতে এমন একটি বিধান রয়েছে, যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী দেশ গ্রিনল্যান্ডে সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখতে পারবে না। একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রের লিখিত অনুমতি ছাড়া তারা ‘সংবেদনশীল খাতে বিনিয়োগ’ও করতে পারবে না।
ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেট্টে ফ্রেডেরিকসেন জানিয়েছেন, আগামী সপ্তাহে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হবে।
তিনি বলেন, চুক্তিটি ‘আর্কটিক ও উত্তর আটলান্টিক অঞ্চলে আমাদের যৌথ নিরাপত্তা জোরদার করবে’। একই সঙ্গে এটি ‘ডেনমার্ক রাজ্যের সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং গ্রিনল্যান্ডের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দেয়’।
তবে চুক্তিটি কার্যকর হওয়ার আগে আইনপ্রণেতাদের অনুমোদন প্রয়োজন বলেও জানিয়েছেন তিনি। তাঁর ভাষায়, এটি কার্যকর করতে প্রয়োজনীয় সংসদীয় প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হবে।
গ্রিনল্যান্ড সরকারের চেয়ারম্যান জেন্স-ফ্রেডেরিক নিয়েলসেন এক বিবৃতিতে বলেছেন, তারা এমন একটি চুক্তিতে প্রবেশ করতে যাচ্ছেন, যা গ্রিনল্যান্ড, ডেনমার্ক ও যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও জোরদার করবে।
তিনি বলেন, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ডের স্বার্থ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতায় তাদের অবস্থানকে স্বীকৃতি দেয়। তাঁর মতে, এটি সবার জন্যই উপকারী।
মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও চুক্তিটিকে ‘ঐতিহাসিক চুক্তি’ এবং ‘যুক্তরাষ্ট্র ও আমেরিকান জনগণের জন্য বিশাল বিজয়’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, চুক্তিটি গ্রিনল্যান্ড নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তাসংক্রান্ত উদ্বেগের ‘স্থায়ী ও সম্পূর্ণ সমাধান’ করেছে।
তবে পূর্ণাঙ্গ লিখিত চুক্তি এখনো প্রকাশ করা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা চুক্তির কিছু বিষয় তুলে ধরেছেন, যদিও বিস্তারিত নথি প্রকাশ করেননি।
ওই কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান হলো—ভবিষ্যতে গ্রিনল্যান্ড স্বাধীন দেশ হয়ে গেলেও চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হবে না।
তিনি আরও জানান, চুক্তির অধীনে গ্রিনল্যান্ড বা ডেনমার্কের অনুমোদন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র অতিরিক্ত সামরিক স্থাপনা নির্মাণ করতে পারবে। এর মধ্যে স্থায়ী প্রবেশাধিকার, সামরিক ঘাঁটি স্থাপন এবং আকাশপথ ব্যবহারের অধিকারও রয়েছে।
এ ছাড়া ন্যাটোর বাইরের দেশগুলোকে গ্রিনল্যান্ডে সামরিক ঘাঁটি নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার কথা রয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য হুমকি তৈরি করতে পারে—এমন গ্রিনল্যান্ডের সংবেদনশীল খাতে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর বিনিয়োগও নিষিদ্ধ করার কথা বলা হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা বিশেষভাবে রাশিয়া ও চীনের কথা উল্লেখ করে বলেন, নতুন চুক্তি তাদের গ্রিনল্যান্ডে সেনা মোতায়েন বা ‘সংবেদনশীল খাতে’ বিনিয়োগ করা থেকে বিরত রাখবে।
চুক্তির পূর্ণাঙ্গ সরকারি নথি প্রকাশ না হওয়ায় এটি ১৯৫১ সালের ডেনমার্ক-যুক্তরাষ্ট্রের চুক্তি থেকে ঠিক কতটা আলাদা, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
১৯৫১ সালের ওই চুক্তির অধীনেই যুক্তরাষ্ট্র গ্রিনল্যান্ডে নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী বিপুল সংখ্যক সেনা পাঠানোর অধিকার পেয়েছিল।
বর্তমানে গ্রিনল্যান্ডের উত্তর-পশ্চিম প্রান্তের পিটুফিক সামরিক ঘাঁটিতে যুক্তরাষ্ট্রের ১০০ জনেরও বেশি সামরিক সদস্য স্থায়ীভাবে অবস্থান করছেন।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, রাশিয়া ও চীনের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে রক্ষা করতে তাঁর পরিকল্পিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে গ্রিনল্যান্ড অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই প্রকল্পে ইউরোপীয় মিত্ররাও সহযোগিতা করতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেছেন।
গ্রিনল্যান্ডে বিপুল পরিমাণ বিরল খনিজ রয়েছে, যার বড় অংশ এখনো উত্তোলন করা হয়নি। মোবাইল ফোন, বৈদ্যুতিক যানবাহনসহ বিভিন্ন আধুনিক প্রযুক্তি তৈরিতে এসব খনিজের অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
ফলে দ্বীপটির কৌশলগত অবস্থানের পাশাপাশি এর প্রাকৃতিক সম্পদও যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশের আগ্রহের অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা



