
ইসলামি শরিয়তে শুক্রবার বা জুম্মার দিনকে সপ্তাহের শ্রেষ্ঠ দিন বলা হয়। এই দিনের প্রধান আমলের মধ্যে রয়েছে ভালোভাবে গোসল করা, পরিষ্কার পোশাক ও আতর ব্যবহার করা, দ্রুত মসজিদে যাওয়া, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা, সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করা এবং নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ করা।
এ ছাড়া জুম্মার দিন আসরের পর থেকে মাগরিব পর্যন্ত সময়টি দোয়া কবুলের বিশেষ সময় হিসেবে বিবেচিত। তাই এ সময়ে ইস্তিগফার ও দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
আমাদের ব্যস্ত জীবনের মাঝে শুক্রবার বা জুম্মার দিনটি আসে এক ধরনের আধ্যাত্মিক প্রশান্তি নিয়ে। বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের কাছে এই দিনটির গুরুত্ব অপরিসীম। তবে অনেকেই জানতে চান, কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জুম্মার দিনের সঠিক ও সুন্নাহসম্মত আমলগুলো কী কী?
নির্ভরযোগ্য দলিলের ভিত্তিতে জুম্মার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো তুলে ধরা হলো।
শুক্রবার বা জুম্মার দিনের ফজিলত কেন এত বেশি?
হাদিস শরিফে শুক্রবারকে ‘সাপ্তাহিক ঈদের দিন’ বলা হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সূর্য উদিত হওয়ার দিনগুলোর মধ্যে জুম্মার দিনটিই হলো সর্বোত্তম।’ (সহিহ মুসলিম)
এই দিনে হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করা হয়েছিল এবং এই দিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। সবচেয়ে বড় কথা, এই দিনে এমন একটি মুহূর্ত রয়েছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা-ই চায়, আল্লাহ তা কবুল করেন।
শুক্রবারের প্রধান আমল
সারাদিনের রুটিন অনুযায়ী জুম্মার দিনের আমলগুলো কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়।
১. সকালের প্রস্তুতি ও পরিচ্ছন্নতা
জুম্মার নামাজের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে পরিচ্ছন্নতা অর্জন করা গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত।
গোসল করা: জুম্মার দিনে ভালোভাবে গোসল করা প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের জন্য ওয়াজিব বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা। এ বিষয়ে সহিহ বুখারিতে হাদিস বর্ণিত হয়েছে।
পরিষ্কার পোশাক ও সুগন্ধি: নিজের কাছে থাকা সবচেয়ে ভালো ও পরিষ্কার পোশাক পরিধান করা এবং আতর বা সুগন্ধি ব্যবহার করা।
মিসওয়াক করা: দাঁত পরিষ্কারের জন্য মিসওয়াক করা নবীজির (সা.) অন্যতম প্রিয় সুন্নাত।
২. জুম্মার নামাজের জন্য মসজিদে গমন
আগে আগে মসজিদে যাওয়া: আজান হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বা তার আগেই মসজিদে উপস্থিত হওয়া উত্তম। আগে গেলে ফেরেশতারা খাতায় নাম লিপিবদ্ধ করেন।
খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা: ইমামের খুতবা চলাকালীন কোনো কথা বলা নিষেধ। এমনকি পাশের কাউকে ‘চুপ করো’ বলাও অনুচিত। তাই চুপচাপ মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা ওয়াজিব।
৩. সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করা
শুক্রবারের অন্যতম সেরা আমল হলো পবিত্র কোরআনের ১৮ নম্বর সূরা ‘আল-কাহাফ’ পাঠ করা।
পড়ার সময়: বৃহস্পতিবার সূর্যাস্তের পর থেকে শুক্রবার সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেকোনো সময় সূরা কাহাফ পড়া যায়।
ফজিলত: হাদিসে এসেছে, যে ব্যক্তি জুম্মার দিনে সূরা কাহাফ পাঠ করবে, তার জন্য দুই জুম্মার মধ্যবর্তী সময় নূরে আলোকিত হয়ে থাকবে। (সুনানে বায়হাকি)
এ ছাড়া সূরা কাহাফের প্রথম ১০ আয়াত মুখস্থ করলে দাজ্জালের ফিতনা থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
৪. বেশি বেশি দরুদ শরিফ পাঠ
রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, ‘তোমরা জুম্মার দিনে আমার ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করো।’ (আবু দাউদ)
সবচেয়ে উত্তম হলো নামাজের ‘দরুদে ইব্রাহিম’ পড়া। তবে সংক্ষেপে ‘সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ পড়লেও দরুদের সওয়াব পাওয়া যাবে।
৫. আসরের পর বিশেষ দোয়া ও ইস্তিগফার
জুম্মার দিনে দোয়া কবুলের একটি বিশেষ মুহূর্ত বা ‘সায়াতুল ইজাবাহ’ রয়েছে। জাবির (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিস এবং অধিকাংশ ইসলামিক স্কলারের মতে, সেই মহামূল্যবান সময়টি হলো শুক্রবার আসরের নামাজের পর থেকে মাগরিবের আগ পর্যন্ত।
এ সময় দুনিয়াবি কাজ থেকে বিরত হয়ে আল্লাহর জিকির, ইস্তিগফার এবং নিজের মনের চাওয়াগুলো আল্লাহর কাছে তুলে ধরে দোয়া করা উচিত।
শুক্রবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল কোনটি?
শুক্রবারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো জুম্মার নামাজ আদায় করা। এর পাশাপাশি সুন্নাত আমলগুলোর মধ্যে সূরা কাহাফ তিলাওয়াত করা এবং আসরের পর দোয়া করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ।
শুক্রবার একা রোজা রাখা কি জায়েজ?
শুধু শুক্রবারকে নির্দিষ্ট করে নফল রোজা রাখা হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে। তবে কেউ যদি বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার অথবা শুক্রবার ও শনিবার মিলিয়ে রোজা রাখেন, তাহলে তা জায়েজ। (সহিহ বুখারি)
শুক্রবার আসরের পর কোন দরুদ পড়তে হয়?
আসরের পর নির্দিষ্ট কোনো দরুদ পড়ার বাধ্যবাধকতা নেই। যেকোনো সহিহ দরুদ পড়া যায়। তবে অনেক বুজুর্গ আলেম আসরের পর ৮০ বার বিশেষ একটি দরুদ-‘আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিনিন নাবিয়্যিল উম্মিয়্যি…’-পড়ার আমলের কথা উল্লেখ করেছেন।
তথ্যসূত্র:সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, ও সুনানে বায়হাকি।



