
ক্রীড়া ভাতার আওতায় থাকা ৩০০ ক্রীড়াবিদের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করে ৩১ জনকে ভাতা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নতুন করে প্রায় ৯৫ জন ক্রীড়াবিদকে অন্তর্ভুক্ত করার প্রক্রিয়া চলছে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করা কোচ ও রেফারিদেরও অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
রোববার (৪ অক্টোবর) সচিবালয়ে ক্রীড়াকার্ডধারীদের সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আয়োজিত আলোচনা সভার শুরুতে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমানে ৩০০ জন ক্রীড়াবিদকে ক্রীড়া ভাতা দেওয়া হচ্ছে। চার মাস পরপর তাদের পারফরম্যান্স পর্যালোচনা করা হচ্ছে। প্রথম চার মাসের পর্যালোচনায় প্রায় ৩১ জনের পারফরম্যান্স আশানুরূপ না হওয়ায় তাদের ভাতার আওতা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো ৫০০ জনের পরিপূর্ণ তালিকা পাইনি। এর মধ্যে ৩১ জনকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি আরও প্রায় ৯৫ জনকে নতুন করে সংযোজন করা হচ্ছে। ফলে এই পর্যায়ে আমাদের ক্রীড়া ভাতার আওতায় প্রায় ৪০০ জনের কাছাকাছি ক্রীড়াবিদ থাকবেন।’
আমিনুল হক বলেন, ক্রীড়া ভাতার জন্য ৫০০ জনের কোটা নির্ধারণ করা হলেও এখনই তা পূরণ করা হবে না। চার মাস পরপর পর্যালোচনার মাধ্যমে যোগ্য ক্রীড়াবিদদের তালিকায় যুক্ত করা হবে এবং প্রয়োজন হলে বর্তমান তালিকা থেকে কাউকে বাদ দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ক্রীড়া ভাতা প্রদানের মূল লক্ষ্য হচ্ছে খেলাধুলাকে পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা এবং ক্রীড়াবিদদের পেশাদারত্ব ও দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা আরও সুদৃঢ় করা। এরই মধ্যে অনেক ক্রীড়াবিদ এই ভাতার অর্থ দিয়ে ঘর নির্মাণ, ব্যবসা বা পরিবারের স্বাবলম্বিতার জন্য কাজে লাগাচ্ছেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, চলতি অর্থবছরের বাজেটে ক্রীড়া ভাতা ও নতুন ক্রীড়া কার্যক্রমের জন্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ক্রীড়া ভাতার জন্য বছরে ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রয়েছে।
যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. মাহবুব-উল-আলম বলেন, গত অর্থবছরে মন্ত্রণালয় ৩০০ জনকে ক্রীড়া ভাতা ও ক্রীড়া কার্ড এবং আরও ২৫ জনকে শুধু ক্রীড়া কার্ড দিয়েছে। চলতি অর্থবছরে আরও ৫০০ জনকে ক্রীড়া কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তারা মাসিক ১ লাখ টাকা করে ক্রীড়া ভাতা পাবেন।
তিনি বলেন, ‘এই ক্রীড়া কার্ডের আওতায় যেন আমাদের যারা স্বনামধন্য জাতীয় পর্যায়ে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেসব খেলোয়াড় আছেন, তাদের যেন আমরা একটা প্রাতিষ্ঠানিক রূপদান দিতে পারি, তাদের যে পেশাকে নিশ্চয়তা করতে পারি, সেজন্য আমাদের প্রতিমন্ত্রীর একটি নির্দেশনা রয়েছে। আমরা এই ক্রীড়া কার্ডের আওতায় অন্যান্য যে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা আছে, সেগুলো যেন দিতে পারি।’
সচিব জানান, ক্রীড়াবিদদের জন্য এসব সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক উপস্থিত ছিলেন। সভায় বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, জীবন বীমা করপোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক, ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে ন্যূনতম একজন যুগ্ম সচিব অথবা অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়।
ক্রীড়াবিদদের জন্য দেওয়া ক্রীড়া কার্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা, বিমা এবং বিভিন্ন পরিবহনসেবায় অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, ক্রীড়াবিদরা নিয়মিত ইনজুরিতে পড়েন। বিশেষ করে ক্রিকেট ও ফুটবলের বাইরে অনেক ক্রীড়াবিদ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল নন। ফলে নিজের বা পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে অনেক সময় প্রয়োজনীয় চিকিৎসা নেওয়া সম্ভব হয় না।
‘আমরা চেষ্টা করেছি স্বনামধন্য স্বাস্থ্যসেবাগুলো কীভাবে আমাদের ক্রীড়াবিদদের সামাজিক সুযোগ-সুবিধার মধ্য দিয়ে ক্রীড়া কার্ডের অন্তর্ভুক্ত করা যায়। সেই লক্ষ্য নিয়েই আজকের এই বসা।’
বড় ধরনের ইনজুরি বা দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে ক্রীড়াবিদ ও তাদের পরিবারের জন্য বিমা সুবিধা নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা করা হবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া রেলপথ, নৌপথ, বিমান ও সড়কপথে ক্রীড়া কার্ডের মাধ্যমে ক্রীড়াবিদদের বিভিন্ন নাগরিক সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার বিষয়েও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনা করা হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশের জন্য যারা খেলছেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার এসব সুযোগ-সুবিধা দিতে চায়। এর মাধ্যমে ক্রীড়াবিদদের পেশাদারত্ব নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি দেশের প্রতি তাদের দায়বদ্ধতাও আরও বাড়বে বলে আশা করেন তিনি।
আমিনুল হক বলেন, শুধু এশিয়ান গেমস বা অলিম্পিকে অংশ নেওয়াই সরকারের লক্ষ্য নয়। পদকের জন্য লড়াই করতে ক্রীড়াবিদদের প্রস্তুত করা হবে।
তিনি বলেন, এশিয়ান গেমস শেষ হওয়ার পর বছরব্যাপী প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। এশিয়ান গেমস, অলিম্পিক, কমনওয়েলথ গেমসসহ যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের ভালো করার সুযোগ রয়েছে, সেগুলোকে লক্ষ্য করেই প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
‘অংশগ্রহণ করাই বড় কথা, আমরা এভাবে যেতে চাই না। আমরা সত্যিকার অর্থেই চাই, আমরা ভবিষ্যতে পদকের জন্য লড়ব। সেইভাবে নিজেদের প্রস্তুত করেই আমরা অংশগ্রহণ করতে চাই।’
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ক্রীড়াবিদরা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন। সরকারের পক্ষ থেকে ক্রীড়া ভাতা ও ক্রীড়া কার্ডের মাধ্যমে সামাজিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা হলে ক্রীড়াবিদরা দেশের জন্য আরও ভালোভাবে পারফর্ম করতে পারবেন।
আগামী পাঁচ বছর পর অলিম্পিকের মতো সর্বোচ্চ আসরে শুধু অংশগ্রহণ নয়, পদকের জন্য লড়াই করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করার কথা জানান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, খেলাধুলাকে তৃণমূল পর্যায় থেকে ছড়িয়ে দিয়ে প্রতিভা অন্বেষণ করতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ইউনিয়ন পর্যায়ের ক্লাব, উপজেলা ও জেলা পর্যায় এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের ক্লাবগুলোতে খেলাধুলাবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
খেলাধুলার মাধ্যমে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের গুণগত পরিবর্তন সম্ভব বলে মনে করেন তিনি। পাশাপাশি তরুণদের মাদক ও বিভিন্ন আসক্তি থেকে দূরে রাখা এবং সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় খেলাধুলা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলেও উল্লেখ করেন প্রতিমন্ত্রী।
তিনি বলেন, শারীরিক ও মানসিক বিকাশের পাশাপাশি মননশীলতার বিকাশেও খেলাধুলার ভূমিকা রয়েছে। আগামী এক, দুই বা তিন বছরের মধ্যে খেলাধুলাকে অন্যতম মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগিয়ে সমাজব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার প্রত্যাশা রয়েছে।
সভায় উপস্থিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করে ক্রীড়াবিদদের জন্য কী কী সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা যায়, সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। পরবর্তী সময়ে এসব সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হবে।
তথ্যসূত্র: জাগো নিউজ ২৪
