
বিশ্বকাপের শিরোপা নির্ধারণী মহারণে আজ রাতে যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন স্পেন। বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হবে বহুল প্রতীক্ষিত এই ফাইনাল। নতুন বিশ্বচ্যাম্পিয়নকে বরণ করে নেওয়ার মধ্য দিয়েই পর্দা নামবে ফুটবলের সর্ববৃহৎ আসরের।
ফাইনালের আগে দুই দলের টুর্নামেন্টজুড়ে পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, আক্রমণ, পাসিং, রক্ষণ ও ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে দুই দলই আলাদা আলাদা জায়গায় নিজেদের শ্রেষ্ঠত্বের ছাপ রেখেছে। একদিকে লিওনেল মেসির নেতৃত্বে দুর্দান্ত ছন্দে থাকা আর্জেন্টিনা, অন্যদিকে বল দখল ও রক্ষণে প্রায় নিখুঁত স্পেন।
আক্রমণে এগিয়ে আর্জেন্টিনা
টুর্নামেন্টে সাত ম্যাচে আর্জেন্টিনা করেছে ১৯ গোল, যেখানে তাদের প্রত্যাশিত গোল (xG) ছিল ১৫.৩৮। তারা মোট ১১৩টি শট নিয়েছে, যার মধ্যে ৪৬টি অন-টার্গেট এবং ৪৮টি লক্ষ্যের বাইরে গেছে। গোলে রূপান্তরের হার ১৭ শতাংশ।
আর্জেন্টিনার পেনাল্টি বক্সের ভেতর থেকে নেওয়া শট ৬৫টি, বাইরে থেকে ৪৮টি এবং হেড থেকে শট ২২টি। এছাড়া দলটি করেছে ১২টি অ্যাসিস্ট এবং ১টি পেনাল্টি গোল।
অন্যদিকে স্পেন সাত ম্যাচে করেছে ১৩ গোল, যার মধ্যে ১২টিই এসেছে পেনাল্টি বক্সের ভেতর থেকে। তারা মোট ১২০টি শট নিয়েছে। এর মধ্যে ৪২টি অন-টার্গেট এবং ৫৩টি লক্ষ্যের বাইরে গেছে। গোলে রূপান্তরের হার ১১ শতাংশ।
স্পেনের পেনাল্টি বক্সের ভেতর থেকে শট ৭১টি, বাইরে থেকে ৪৯টি এবং হেড থেকে ১৭টি। দলটি ২০টি বড় গোলের সুযোগ তৈরি করলেও ৯টি কাজে লাগাতে পারেনি। এছাড়া করেছে ৯টি অ্যাসিস্ট।
পাসিংয়ে সমানে সমান
পাসিংয়ে দুই দলের নির্ভুলতা একই হলেও সংখ্যায় সামান্য এগিয়ে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনা মোট ৪,৭৭২টি পাস দেওয়ার চেষ্টা করে সফল হয়েছে ৪,৩২৪টিতে। তাদের পাসিং নির্ভুলতা ৯১ শতাংশ। এছাড়া ১০২টি ক্রসের মধ্যে ৩৪টি সফল হয়েছে। দলটি আদায় করেছে ৩৭টি কর্নার ও ৮৯টি ফ্রি-কিক।
স্পেন দিয়েছে ৪,৫৯২টি পাস, যার মধ্যে সফল হয়েছে ৪,১৫৬টি। তাদের পাসিং নির্ভুলতাও ৯১ শতাংশ। বল দখলের গড় হার ছিল ৬৩.৭ শতাংশ। এছাড়া ১৫৪টি ক্রস থেকে ২১ শতাংশ সফলতা এবং ৪৫টি কর্নার আদায় করেছে দলটি।
রক্ষণে স্পেনের আধিপত্য
রক্ষণভাগে স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে স্পেন।
আর্জেন্টিনা সাত ম্যাচে ৭ গোল হজম করেছে এবং ২টি ক্লিন শিট রেখেছে। পুরো টুর্নামেন্টে তারা ১,৬০৯ বার প্রেসিং করেছে এবং ২৯৭টি ফোরসড টার্নওভার আদায় করেছে। দলটি কোনো লাল কার্ড না পেলেও দেখেছে ৯টি হলুদ কার্ড।
অন্যদিকে স্পেন সাত ম্যাচে মাত্র ১টি গোল হজম করেছে এবং ৬টি ক্লিন শিট রেখে বিশ্বকাপে নতুন রেকর্ড গড়েছে। প্রতিপক্ষ তাদের বিপক্ষে মাত্র ৪৪টি শট নিতে পেরেছে, যার মধ্যে ১০টি ছিল লক্ষ্যে।
গোলরক্ষক উনাই সিমন ৯৩ শতাংশ সেভ রেট ধরে রেখে টানা ৬৫০ মিনিট গোল না খাওয়ার কীর্তি গড়েছেন। পাশাপাশি স্পেন সব ধরনের আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা মিলিয়ে টানা ৩৭ ম্যাচ অপরাজিত থেকে যৌথ বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করেছে।
আর্জেন্টিনার ভরসা মেসি
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে সর্বোচ্চ ৮ গোল ও ৪ অ্যাসিস্ট করেছেন লিওনেল মেসি। এছাড়া তিনি নিয়েছেন ৩৪টি শট, দিয়েছেন ৪১টি ক্রস এবং ১৫৪ বার লাইন ব্রেক করেছেন।
এনজো ফার্নান্দেজ করেছেন ১২২টি সফল লাইন ব্রেক এবং ২৯৪টি স্প্রিন্ট।
লিয়ান্দ্রো পারেদেস দিয়েছেন দলের সর্বোচ্চ ৫২১টি পাস।
হুলিয়ান আলভারেজ করেছেন ২১৫ বার প্রেসিং, আর অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার পুরো টুর্নামেন্টে দৌড়েছেন ৭৫.৫৭ কিলোমিটার।
স্পেনের প্রাণভোমরা রদ্রি-ইয়ামাল
স্পেনের হয়ে রদ্রি করেছেন বিশ্বকাপের এক আসরে সর্বোচ্চ ৬৪৮টি সফল পাসের নতুন রেকর্ড।
পাউ কুবারসি সফল করেছেন ৫৪৭টি পাস এবং আইমেরিক লাপোর্তে দিয়েছেন ৫৩৩টি সফল পাস।
দলের সর্বোচ্চ ৫ গোল করেছেন মিকেল ওইয়ারসাবাল।
লামিন ইয়ামাল সম্পন্ন করেছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ ৩০টি সফল ড্রিবল।
এছাড়া মার্ক কুকুরেল্লা ও দানি ওলমো যৌথভাবে দলের সর্বোচ্চ ২টি করে অ্যাসিস্ট করেছেন।
মুখোমুখি পরিসংখ্যান
আন্তর্জাতিক ফুটবলে এখন পর্যন্ত ১৪ বার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও স্পেন।
- আর্জেন্টিনার জয়: ৬টি
- স্পেনের জয়: ৬টি
- ড্র: ২টি
১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা ২-১ গোলে স্পেনকে হারিয়েছিল। ২০১০ সালের প্রীতি ম্যাচে আলবিসেলেস্তেরা জিতেছিল ৪-১ ব্যবধানে। তবে ২০১৮ সালের প্রীতি ম্যাচে স্পেন ৬-১ গোলের বড় জয় তুলে নেয়। সেই ম্যাচে চোটের কারণে খেলেননি লিওনেল মেসি।
এবারের ফাইনালে দুই দলের সাম্প্রতিক ফর্ম, পরিসংখ্যান এবং ইতিহাস-সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে এক রোমাঞ্চকর লড়াইয়ের। এখন দেখার বিষয়, বিশ্বকাপের মঞ্চে শেষ হাসি হাসে মেসির আর্জেন্টিনা, নাকি ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ন স্পেন।
তথ্যসূত্র: যমুনা টিভি