আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে খুশি নন তার বাবা-মা

বহুল আলোচিত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শহীদ আবু সাঈদ হত্যা মামলার রায়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তার মা-বাবা। তারা অভিযোগ করেছেন, বড় অপরাধীরা এখনও আড়ালে রয়েছেন এবং মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির সংখ্যা যথেষ্ট নয়।
বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) দুপুরে রংপুরের পীরগঞ্জ উপজেলার বাবনপুর এলাকার জাফরপাড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে আবু সাঈদের মা-বাবা রায়-পরবর্তী প্রতিক্রিয়ায় বলেন, “আমার ছেলেকে যারা নির্যাতন করেছে, তাদের অনেকেই এখনো শাস্তির বাইরে। ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি পোমেল বড়ুয়া আমার ছেলেকে গলা টিপে ধরেছিলেন, অথচ তার সর্বোচ্চ শাস্তি হয়নি। আরো অনেকের ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল।”
আবু সাঈদের বাবা মকবুল হোসেন অভিযোগ করেন, মামলার গুরুত্বপূর্ণ আসামি পলাতক এবং বড় অপরাধীরা আড়ালে রয়েছেন। পুলিশ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বাঁচিয়ে দিয়ে অপেক্ষাকৃত ছোটদের সাজা দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, “যারা পালিয়ে গেছেন, তাদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।” তিনি রায়ের বিষয়ে আইনজীবীদের সঙ্গে পরামর্শ করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেবেন বলেও জানান।
আবু সাঈদের মা মনোয়ারা বেগম বলেন, “আমার ছেলে অনেক অত্যাচারের শিকার হয়েছে। আরও বেশি আসামির ফাঁসি হলে আমরা কিছুটা স্বস্তি পেতাম। এই রায়ে আমরা খুশি নই।”
রায়ের বিস্তারিত
- মৃত্যুদণ্ড: পুলিশের সাবেক এএসআই আমির হোসেন ও সাবেক কনস্টেবল সুজন চন্দ্র (গ্রেপ্তার অবস্থায়)
- যাবজ্জীবন কারাদণ্ড: সাবেক সহকারী কমিশনার আরিফুজ্জামান জীবন, তাজহাট থানার সাবেক ওসি রবিউল ইসলাম নয়ন, বিশ্ববিদ্যালয় পুলিশ ক্যাম্পের সাবেক ইনচার্জ বিভূতি ভূষণ রায় মাধব
- ১০ বছরের কারাদণ্ড: সাবেক উপাচার্য ড. মো. হাসিবুর রশীদ বাচ্চু, রংপুরের সাবেক কমিশনার মনিরুজ্জামান বেল্টু, গণিত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মশিউর রহমান, লোকপ্রশাসন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আসাদুজ্জামান মণ্ডল আসাদ, তৎকালীন ছাত্রলীগ সভাপতি পোমেল বড়ুয়া
- ৫ বছরের কারাদণ্ড: সাবেক ডেপুটি কমিশনার (ক্রাইম) আবু মারুফ হোসেন টিটু (পলাতক), সাবেক অতিরিক্ত উপকমিশনার শাহ নূর আলম পাটোয়ারী সুমন (পলাতক), সাবেক প্রক্টর শরিফুল ইসলাম, সহকারী রেজিস্ট্রার হাফিজুর রহমান তুফান, ছাত্রলীগ নেতা মাহাফুজুর রহমান শামীম, মাসুদুল হাসান মাসুদ, এমরান চৌধুরী দিশা, অফিস সহকারী মাহাবুবার রহমান বাবু, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ডা. সারোয়ার হোসেন
- ৩ বছরের কারাদণ্ড: ছাত্রলীগ নেতা ফজলে রাব্বী, আখতার হোসেন, সেজান আহ্মেদ আরিফ, ধনঞ্জয় কুমার টগর, বাবুল হোসেনসহ বিশ্ববিদ্যালয় কর্মচারীরা
প্রক্টর অফিসের চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী আনোয়ার পারভেজ ওরফে আপেলের হাজতবাসকালকে সাজার মেয়াদ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
আবু সাঈদের সহপাঠী আরমান বলেন, “আমরা এই রায়ে সন্তুষ্ট নই। প্রত্যাশা অনুযায়ী রায় হয়নি।” আরেক সহপাঠী শামসুর রহমান সুমন বলেন, “এই রায় বিতর্কিত। হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।”
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. শওকাত আলী বলেন, “এই রায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। আমরা আশা করি, এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে এমন নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা সম্ভব হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা এবং শিক্ষার পরিবেশ বজায় রাখতে আমরা আরো কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করব।”
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ১৬ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় রংপুরে পুলিশের গুলিতে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ নিহত হন। তার মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয় এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়। বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ রায় ঘোষণা করেন।
সূত্র: কালের কণ্ঠ



