শিক্ষা
প্রধান খবর

২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চার পাঠ্যবই

দেশের প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার মুখস্থবিদ্যা ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক মানসিকতা থেকে শিক্ষার্থীদের বের করে এনে আনন্দময়, জীবনমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষায় গড়ে তুলতে ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চতুর্থ ও ষষ্ঠ শ্রেণিতে যুক্ত হচ্ছে নতুন চারটি পাঠ্যবই। রোববার (২৫ অক্টোবর) জাতীয় শিক্ষাক্রম সমন্বয় কমিটির (এনসিসি) সভায় বইগুলো চূড়ান্ত অনুমোদন পাওয়ার কথা রয়েছে।

শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশ, নৈতিকতা, সৃজনশীল চিন্তাশক্তি এবং বাস্তবমুখী কর্মদক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে বইগুলো প্রণয়ন করেছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। বইগুলো হলো-চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ ও ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণির ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’।

এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, রাষ্ট্রকাঠামো মেরামতের জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার আলোকে বহুমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। এর অংশ হিসেবে শিক্ষা ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় সংস্কারে মনোনিবেশ করেছেন তিনি। শিক্ষাব্যবস্থাকে আনন্দময়, বাস্তবমুখী ও নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন করে তুলতে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছেন। তাঁর চিন্তাধারা, অভিজ্ঞতা ও গবেষণার প্রতিফলন হিসেবেই পাঠ্যক্রমে নতুন বইগুলো যুক্ত করা হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে গত ১৫ বছর কাজ করে তিনি বুঝেছেন, প্রধানমন্ত্রী চান শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের মধ্যে মানবিক মূল্যবোধ, সামাজিক শিষ্টাচার, পারিবারিক সংস্কৃতি ও সুনাগরিকের গুণাবলি তৈরি হোক। পাশাপাশি শিক্ষার মাধ্যমে কর্মসংস্থানের সুযোগও সৃষ্টি হোক। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় এ কার্যক্রম এগিয়ে নিতে এনসিটিবিকে সম্পৃক্ত করা হয়। এ লক্ষ্যে এনসিটিবি একটি দল গঠন করে। এতে প্রধানমন্ত্রীর নীতিমালা প্রণয়নে সহযোগিতাকারীদের পাশাপাশি বিভিন্ন পর্যায়ে শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বরেণ্য শিক্ষাবিদদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর রূপকল্প বাস্তবায়নে ধারাবাহিক আলোচনা ও পরামর্শ সভা করছেন।

এনসিটিবি সংশ্লিষ্টরা জানান, সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী আনন্দ, খেলাধুলা, সংস্কৃতির মেলবন্ধন এবং হাতে-কলমে কারিগরি দক্ষতানির্ভর পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়েছে। তাঁদের প্রত্যাশা, নতুন বইগুলো শিক্ষার্থীদের শিখনপদ্ধতি ও অভিজ্ঞতায় পরিবর্তন আনবে। চারটি বইয়ের প্রায় দেড় কোটি কপি মুদ্রণ করা হবে।

এনসিটিবির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মোহাম্মদ ফখরুল মাওলা বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তকের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন ও যাচাইয়ের কাজ ইতিমধ্যে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। ২৫ অক্টোবর এনসিসির সভায় অনুমোদনের পরই বইগুলোর বিষয়বস্তু মুদ্রণের জন্য ছাপাখানায় পাঠানো হবে।

এনসিটিবি জানায়, গত ১২ জুলাই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউটে চার মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের কর্মশালায় বইগুলোর রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়। পরে বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাবিদদের সমন্বয়ে চূড়ান্ত পাণ্ডুলিপি তৈরি করা হয়।

এনসিটিবির সদস্য (পাঠ্যপুস্তক) অধ্যাপক মোহাম্মাদ আবু নাসের টুকু জানান, নতুন চারটি বই মুদ্রণের সব প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এনসিসির অনুমোদনের পর আগামী ১৫ ডিসেম্বরের মধ্যে প্রায় দেড় কোটি কপি বই মুদ্রণের কাজ শেষ হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

খেলাধুলা: সুস্থ জীবনধারা ও আত্মরক্ষার কৌশল

এনসিটিবি জানায়, শিক্ষার্থীদের বয়স ও মানসিক বিকাশ বিবেচনায় চতুর্থ শ্রেণির ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে। ১৪টি অধ্যায়ে সাজানো বইটির মূল উদ্দেশ্য, শিশুদের শৈশব থেকেই সুস্থ জীবনধারা ও ক্রীড়াচর্চায় আগ্রহী করে তোলা।

বইটিতে ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার, অ্যাথলেটিকস ও দাবাসহ বিভিন্ন খেলার মৌলিক নিয়মকানুন সহজভাবে তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের শারীরিক সক্ষমতা বাড়ানো ও আত্মরক্ষার কৌশল শেখাতে কারাতে, জুডো এবং তায়কোয়ান্দোর মতো কৌশলও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

খেলার মাঠে বা দৌড়ানোর সময় কেটে যাওয়া, মচকানো, নাক দিয়ে রক্ত পড়া কিংবা হিট স্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিতে করণীয় বিষয়গুলো বাস্তবসম্মত ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা জরুরি প্রয়োজনে প্রাথমিক চিকিৎসাসামগ্রীর ব্যবহার ও আঘাত প্রতিরোধের কৌশলও হাতে-কলমে শিখবে। খেলাধুলার পাশাপাশি পুষ্টি, সামাজিক দক্ষতা ও দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হওয়ার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

বইটির প্রথম অধ্যায়ে ‘স্বপ্ন যখন আকাশ ছোঁয়া’ শিরোনামে একটি অনুপ্রেরণামূলক গল্প রয়েছে। এতে প্রত্যন্ত গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক আয়মান স্যার ও তাঁর সহকর্মী সাদিয়া আপার উদ্যোগে মেয়েদের ফুটবল দল গঠনের গল্প তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক বাধা ও কুসংস্কার পেরিয়ে মেহজাবিনসহ কয়েকজন শিক্ষার্থীর ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা ও বিভাগীয় পর্যায় পেরিয়ে জাতীয় পর্যায়ে বিজয়ী হওয়ার কাহিনির মাধ্যমে দেখানো হয়েছে, খেলাধুলা শুধু শরীর সুস্থ রাখে না; এটি পেশা হিসেবেও আর্থসামাজিক পরিবর্তন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

এনসিটিবি চেয়ারম্যান বলেন, শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা যেন একমুখী ও ক্লান্তিকর না হয়ে ওঠে, সেদিকে বিশেষ নজর রেখে প্রথমবারের মতো ‘খেলাধুলা’ বইটি প্রণয়ন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের সংস্কৃতি: ঐতিহ্য, মূল্যবোধ ও নতুন কুঁড়ি

দেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও লোকজ সংস্কৃতির সঙ্গে শিশুদের পরিচয় ঘটাতে ১১টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ বইটি। এতে ভাষা, পোশাক, শিল্পকলা, খাদ্যসংস্কৃতি, সামাজিক রীতিনীতি এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা বর্ণিল ছবির মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

বইটিতে বাংলা বর্ণমালা চর্চা, বিদ্যালয়ের উৎসব, জাতীয় পতাকা উত্তোলন এবং পিঠা-পুলির মেলবন্ধনের পাশাপাশি বাবা-মায়ের যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও গৃহস্থালির কাজে পারস্পরিক সহযোগিতার আধুনিক রূপও তুলে ধরা হয়েছে।

এ ছাড়া একটি বিশেষ অধ্যায়ে শিশু-কিশোরদের জনপ্রিয় প্রতিভা অন্বেষণমূলক আয়োজন ‘নতুন কুঁড়ি’র ইতিহাস, ১৯৭৬ সালে সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের উদ্যোগ এবং প্রতিযোগিতাটির বিজয়ীদের দুর্লভ ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস: ভীতিহীন ও আনন্দময় শিখন

ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য ছয়টি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ বইটি। পড়াশোনাকে ভীতিমুক্ত ও আনন্দদায়ক করে তোলার দর্শন নিয়ে তৈরি এই বই বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন ধারণা ও শিখনপদ্ধতির সংযোজন।

প্রচলিত পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তে আনন্দময় অভিজ্ঞতা, পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়া এবং সহপাঠক্রমিক কার্যক্রমের মধ্য দিয়ে কীভাবে জ্ঞান অর্জন করা যায়, তা বইটিতে তুলে ধরা হয়েছে। এর মাধ্যমে পাঠ্যভার অনেকাংশে কমবে বলে আশা করছে এনসিটিবি। শিক্ষার্থীরা নিজেদের স্বাস্থ্য, চারপাশের পরিবেশ ও দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার আলোকে আনন্দঘন উপায়ে শিখনফল অর্জন করতে পারবে।

এনসিটিবির কর্মকর্তারা জানান, বইটির মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বুঝতে পারবে, শেখা শুধু মুখস্থ করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়ার বিষয় নয়। নিজের জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবেশ, নিরাপত্তা, সৃজনশীলতা, পারস্পরিক সম্পর্ক এবং দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েও শেখা সম্ভব।

আমার কারিগরি শিক্ষা: ছোট উদ্যোগ, বড় সম্ভাবনা

একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় শিক্ষার্থীদের হাতে-কলমে শেখার অভ্যাস ও সমস্যা সমাধানের মানসিকতা তৈরির লক্ষ্যে আটটি অধ্যায়ে প্রণয়ন করা হয়েছে ষষ্ঠ শ্রেণির ‘আমার কারিগরি শিক্ষা’ বইটি।

শিক্ষার্থীদের শুধু ‘আমি কী জানি’-এই তাত্ত্বিক ধারণায় সীমাবদ্ধ না রেখে ‘আমি কী করতে পারি’, সে বিষয়ে দক্ষ ও স্বাবলম্বী করে তোলাই বইটির মূল লক্ষ্য।

কারিগরি শিক্ষার পরিচিতি, চারপাশের প্রযুক্তি ও নতুন বিশ্ব, ছোট উদ্যোগের সম্ভাবনা, উদ্ভাবন ও পরিবর্তন, সবুজ প্রযুক্তি এবং টেকসই জীবনযাপনসহ বাস্তব জীবনের বিভিন্ন কারিগরি সমস্যা চিহ্নিত করা এবং প্রযুক্তির সহায়তায় সেগুলোর মৌলিক সমাধান খুঁজে বের করার ভিত্তি তৈরি করবে বইটি। নতুন চারটি বইয়ে শব্দকোষের মতো বিশেষ অধ্যায়ও যুক্ত করা হয়েছে।

উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন জানান, চতুর্থ শ্রেণি থেকে শুরু হতে যাওয়া খেলাধুলা ও সংস্কৃতি বিষয় দুটি পরবর্তী সময়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে। অন্যদিকে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ ও কারিগরি শিক্ষা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শ্রেণির পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা হবে।

এনসিটিবির সদস্য (শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. এ. কে. এম. শওকত আলী খান বলেন, নতুন চারটি পাঠ্যপুস্তক চালুর ফলে শিক্ষার্থীরা পুঁথিগত বিদ্যার বাইরে গিয়ে আনন্দময় পরিবেশে বাস্তবমুখী ও দক্ষতাভিত্তিক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পাবে।

তথ্যসূত্র: ইত্তেফাক

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button