অর্থ ও বানিজ্য
প্রধান খবর

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে সরকার-আইএমএফ টানাপোড়েন, মতবিরোধে নতুন চাপ

ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি নিয়ে সরকার ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) মধ্যে নতুন করে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে। ক্ষমতাসীন দলের নির্বাচনী ইশতেহারের অন্যতম প্রধান প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে আন্তর্জাতিক ঋণদাতা সংস্থাটি প্রশ্ন তোলায় দুই পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। শুধু সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচিই নয়, রাজস্ব আহরণ, মুদ্রা বিনিময় হার ও আর্থিক খাতের সংস্কারের গতি নিয়েও ঢাকা ও ওয়াশিংটনের মধ্যে স্নায়ুচাপ তৈরি হয়েছে।

ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক বৈঠকে আইএমএফ স্পষ্ট জানিয়েছে, ফ্যামিলি কার্ডের মতো বড় কোনো কর্মসূচি দ্রুত বাস্তবায়নের আগে এর অর্থনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্যতা যাচাই জরুরি। সংস্থাটির মতে, যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও আনতে পারে।

আগামী অর্থবছরে ৪০ লাখ পরিবারের জন্য ফ্যামিলি কার্ড সুবিধা নিশ্চিত করতে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কাছে ১৩ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীতে এটি হতে যাচ্ছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম বড় একক সম্প্রসারণ। আইএমএফ এই কর্মসূচিকে বিদ্যমান অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা স্কিমের সঙ্গে সমন্বয়ের পরামর্শ দিয়েছে।

একজন কর্মকর্তা জানান, সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ও নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও আইএমএফ প্রশ্ন তুলেছে।

বর্তমানে বাংলাদেশ আইএমএফের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঋণ কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। শর্ত পূরণে ব্যর্থতা ঋণের পরবর্তী কিস্তি ছাড়ে বিলম্ব ঘটাতে পারে। তবে গত জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ পাঁচ কিস্তিতে ৩ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার গ্রহণ করেছে।

এই পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকের সাইডলাইনে সংস্থাটির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুটি বৈঠক করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। একটি বৈঠক হয় আইএমএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক নাইজেল ক্লার্কের সঙ্গে এবং অন্যটি এশিয়া-প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণা শ্রীনিবাসনের সঙ্গে।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থমন্ত্রী স্বীকার করেন, কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য রয়ে গেছে। তিনি বলেন, আইএমএফের সঙ্গে কিছু অমীমাংসিত বিষয় আছে। আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

তিনি আরও বলেন, উন্নয়ন সহযোগীরা বিএনপির ইশতেহারের সঙ্গে মোটামুটি একমত। আলোচনা হচ্ছে মূলত বাস্তবায়নের পদ্ধতি নিয়ে।

সামাজিক খাতের ব্যয়ের বাইরে রাজস্ব আদায় ও ব্যাংক খাতের সংস্কারের গতি নিয়েও মতভেদ দেখা দিয়েছে। আইএমএফ দীর্ঘদিন ধরে বাজারভিত্তিক বিনিময় হার নির্ধারণের দাবি জানিয়ে আসছে, যা ঢাকা এখন পর্যন্ত আংশিকভাবে বাস্তবায়ন করেছে।

এ ছাড়া কর-জিডিপি অনুপাত শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানোর জন্য সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নিতে বলেছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে আর্থিক খাতের সংস্কারের গতি নিয়েও উদ্বেগ জানিয়েছে।

অর্থমন্ত্রী অবশ্য সংস্কারের সময়সীমা নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, নতুন প্রশাসন একটি ব্যতিক্রমী পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ১৭ বছর পর ক্ষমতায় ফিরে সরকার তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, যা ইরান যুদ্ধের কারণে আরও জটিল হয়েছে।

কর্মকর্তাদের মতে, দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই মাসের মধ্যে ব্যাপক সংস্কার বাস্তবায়ন করা অবাস্তব বলেও যুক্তি দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী।

রাজস্ব বৃদ্ধির বিষয়ে সরকারের অবস্থান তুলে ধরে এক কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব হুট করে বাড়ানো সম্ভব নয়। সংস্কারের গতি হতে হবে দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন নিয়ে আইএমএফের উদ্বেগের বিষয়ে ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রেস মিনিস্টার গোলাম মোর্তোজা বলেন, জনস্বার্থ এবং নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিই বর্তমান সরকারের মূল দর্শন। সরকার এসব বিষয়ে আপসহীন। অর্থমন্ত্রী আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের কাছে স্পষ্ট করেছেন যে, সরকার তাড়াহুড়ো করবে না।

বাংলাদেশ দূতাবাসের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আইএমএফ বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে পাশে থাকার এবং নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। উভয় পক্ষই সংলাপ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে।

অন্যদিকে, বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা ও অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠককে অর্থমন্ত্রী ‘খুবই ইতিবাচক’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি জানান, বিশ্বব্যাংক সরকারের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির প্রতি সমর্থন জানিয়েছে এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় অংশীদার হতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

তথ্যসূত্র: দি ডেইলি স্টার

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button