
দেশের ক্ষুদ্র ও অতিক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের আওতামুক্ত রাখার দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতি। সংগঠনটির দাবি, সরকার এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করলে সারা দেশের বিপুলসংখ্যক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ভ্যাট আদায়কারী কর্মকর্তাদের হয়রানির শিকার হবেন এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি (এসএমই) খাতে চরম নৈরাজ্য সৃষ্টি হতে পারে।
শনিবার (২৭ জুন) দুপুরে রাজধানীর মগবাজারে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।
বাজেট পাস হওয়ার পর আগামী মাস থেকে মুদি দোকান, রেস্তোরাঁসহ ১৬ ধরনের ব্যবসাকে মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে দোকান মালিক সমিতি।
গত ২৪ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভ্যাট বাবদ ১ লাখ ৪১ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে। এই আদায় আরও বাড়াতে ২০২৬-২৭ অর্থবছরে মুদিদোকান, প্রসাধনসামগ্রীর দোকানসহ কয়েকটি ব্যবসায়িক খাতকে সুনির্দিষ্ট কর ব্যবস্থার আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। এ সময় সংগঠনের মহাসচিব মো. জহিরুল হক ভূঁইয়াসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসায়ী নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
যেসব ব্যবসা খাতকে ভ্যাটের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে, সেগুলো হলো-মুদিদোকান, তৈরি পোশাক বা কাপড়ের দোকান, কনফেকশনারি, প্রসাধনসামগ্রীর দোকান, প্লাস্টিক ও সিরামিকের গৃহস্থালি পণ্যের দোকান, জুতার দোকান, হার্ডওয়্যার পণ্যের বিক্রেতা, ডেকোরেটরস, মোবাইল ফোন, এসি, ফ্রিজ, ওভেন ও অন্যান্য ইলেকট্রনিকস পণ্যের বিক্রেতা, পেইন্ট ও হার্ডওয়্যার, স্যানিটারি ও ফিটিংস, টাইলসের দোকান, ঢেউটিনের দোকান, রড ও সিমেন্টের ব্যবসা, আসবাবপত্রের দোকান, মিষ্টান্ন ভান্ডার এবং রেস্তোরাঁ।
দোকান মালিক সমিতি বলেছে, অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা কীভাবে ভোক্তার কাছ থেকে ভ্যাট আদায় করবেন, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সংগঠনটির দাবি, ১৯৯১ সালে দেশে ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর সময় তৎকালীন অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, হাটবাজার ও বন্দরের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের ওপর ভ্যাট আরোপ করা হবে না। বর্তমান সিদ্ধান্ত সেই প্রতিশ্রুতির পরিপন্থী।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশে বর্তমানে প্রায় পৌনে আট লাখ ভ্যাট নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠান রয়েছে। গত অর্থবছরে আদায় হওয়া প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকার ভ্যাটের মধ্যে বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (এলটিইউ) আওতাভুক্ত মাত্র ১০৯টি প্রতিষ্ঠান মোট ভ্যাটের প্রায় ৬০ শতাংশ পরিশোধ করেছে। এছাড়া এলটিইউভুক্তসহ বড় ৫ হাজার প্রতিষ্ঠান মিলেই মোট আদায়কৃত ভ্যাটের ৯৮ শতাংশ দিয়েছে।
সমিতির নেতাদের অভিযোগ, বড় প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট ফাঁকি রোধ করা গেলে রাজস্ব বাড়ানোর জন্য ক্ষুদ্র ও অতি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের করজালে আনার প্রয়োজন হবে না।
সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, প্রকৃত ভ্যাটদাতার সংখ্যা বাড়াতে খুচরা পর্যায়ের হয়রানি বন্ধ করে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে দ্রুত অটোমেশন চালু করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে তিনি জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে বড় খাত এবং উৎস পর্যায় থেকে ভ্যাট আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ব্যবসায়ীরা আয়কর আইনের ২১৬ ধারা বাতিলেরও দাবি জানান। তাদের ভাষ্য, এই ধারাটি ‘অসম্মানজনক ও নিপীড়নমূলক’। তাদের অভিযোগ, এ ধারার মাধ্যমে কর কর্মকর্তাদের অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, ফলে মাঠপর্যায়ের অনেক কর্মকর্তা সামান্য ভুলের জন্যও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার ভয় দেখানোর সুযোগ পান।
দোকান মালিক সমিতির দাবি, প্রতি অর্থবছরের আয়কর ও ভ্যাট রিটার্ন সংশ্লিষ্ট অর্থবছর শেষ হওয়ার পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে, অর্থাৎ ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দেওয়ার সুযোগ রাখতে হবে। এরপর ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করবে। ওই সময়ের মধ্যে কোনো দাবি না থাকলে সংশ্লিষ্ট অর্থবছরের কর ও ভ্যাট পরিশোধের সনদ বা ‘বছরের সার্টিফিকেট’ প্রদান করতে হবে।
হেলাল উদ্দিন বলেন, বিদ্যুৎ, পানি ও গ্যাস বিলের মতো ভ্যাট ও আয়কর পরিশোধের ক্ষেত্রেও বছরের শেষে সার্টিফিকেট দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করা উচিত। এছাড়া অডিট বা কথিত বকেয়া করের অজুহাতে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের হয়রানি বন্ধেরও দাবি জানান তিনি।
তথ্যসূত্র: প্রথম আলো