রোহিঙ্গা গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে আইসিজেতে আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু করল মিয়ানমার

রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ অস্বীকার করে জাতিসংঘের সর্বোচ্চ আদালত আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) আত্মপক্ষ সমর্থন শুরু করেছে মিয়ানমার। দেশটির দাবি, অভিযোগকারী রাষ্ট্র গাম্বিয়া এই অভিযোগ প্রমাণের মতো পর্যাপ্ত ও বিশ্বাসযোগ্য তথ্য উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ জানুয়ারি) বিবিসি-র এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়।
আইসিজেতে মিয়ানমারের অবস্থান
নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক বিচার আদালত-এ (আইসিজে) মিয়ানমারের পক্ষে বক্তব্য দেন দেশটির সরকারি প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ ‘ভিত্তিহীন ও প্রমাণহীন’।
তিনি আরও দাবি করেন, পশ্চিম আফ্রিকার দেশ গাম্বিয়া আদালতে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ হাজির করতে পারেনি, যা থেকে গণহত্যার উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয়।
গাম্বিয়ার অভিযোগ
এর আগে চলতি সপ্তাহে গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাওদা জালো আদালতে বলেন, মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিম সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করতে পরিকল্পিতভাবে ‘গণহত্যামূলক নীতি’ অনুসরণ করেছে।
২০১৭ সালের রাখাইন অভিযান
২০১৭ সালে রাখাইন রাজ্য-এ মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানে হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হন এবং ৭ লাখের বেশি মানুষ পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে আশ্রয় নেন।
পরের বছর জাতিসংঘের এক তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, রাখাইন রাজ্যে গণহত্যা এবং দেশের অন্যান্য অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে মিয়ানমারের শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত হওয়া উচিত।
সেনা অভ্যুত্থানের পর অবস্থান
তবে ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখলের পর থেকে মিয়ানমার ওই জাতিসংঘ প্রতিবেদনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে আসছে। দেশটির দাবি, ওই সেনা অভিযান ছিল সন্ত্রাসী ও বিদ্রোহী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে পরিচালিত।
আইসিজেতে কো কো হ্লাইং বলেন, উত্তর রাখাইন রাজ্যে সন্ত্রাসীদের অবাধ তৎপরতা চালাতে দিয়ে মিয়ানমার সরকার নিষ্ক্রিয় থাকতে পারে না। তিনি দাবি করেন, তথাকথিত ‘ক্লিয়ারেন্স অপারেশন’ ছিল সন্ত্রাসবিরোধী ও বিদ্রোহ দমনমূলক সামরিক অভিযান।
আইনজীবীদের যুক্তি
২০১৯ সালে গাম্বিয়া এই মামলা দায়ের করে। সোমবার দাওদা জালো আদালতে বলেন, রোহিঙ্গারা ‘দশকের পর দশক ভয়াবহ নিপীড়ন ও অমানবিক প্রচারণার শিকার’ হয়েছে, যার ধারাবাহিকতায় তাদের অস্তিত্ব নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রীয় নীতি বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
গাম্বিয়ার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবী ফিলিপ স্যান্ডস বলেন, নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের হত্যা এবং তাদের গ্রাম ধ্বংস করা কোনোভাবেই সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের যুক্তিতে ব্যাখ্যা করা যায় না।
তার ভাষায়, সব প্রমাণ একসঙ্গে বিবেচনা করলে একমাত্র যুক্তিসংগত সিদ্ধান্ত হলো-রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে গণহত্যার উদ্দেশ্য স্পষ্ট।
ওআইসি ও শরণার্থী পরিস্থিতি
এই মামলায় গাম্বিয়ার পক্ষে ওআইসি-ভুক্ত ৫৭টি মুসলিম দেশ সমর্থন দিয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে শুধু বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় ১০ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় ও ঘনবসতিপূর্ণ শরণার্থী শিবিরগুলোর একটি বলে জানিয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা।
প্রত্যাবাসন ও ভবিষ্যৎ শঙ্কা
মিয়ানমারের প্রতিনিধি কো কো হ্লাইং আদালতে বলেন, বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রাখাইন রাজ্যের বাসিন্দাদের প্রত্যাবাসনে তার দেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তবে কোভিড-১৯সহ নানা কারণে সেই প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি সতর্ক করে বলেন, এই মামলায় গণহত্যার রায় হলে তা মিয়ানমার ও এর জনগণের ওপর ‘অমোচনীয় কলঙ্ক’ হয়ে থাকবে এবং দেশের ভবিষ্যৎ ও আন্তর্জাতিক সুনামের জন্য এই রায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তথ্যসূত্র: কালবেলা


