আন্তর্জাতিক খবর
প্রধান খবর

ফ্রান্স থেকে আর্জেন্টিনা, আট দেশে বিক্ষোভে উত্তাল রাজপথ

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বড় আকারের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। কিছু বিক্ষোভ এখনো চলছে, আবার কিছু আন্দোলন নতুন নতুন এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে। ফ্রান্স থেকে আর্জেন্টিনা-বিভিন্ন দেশের এসব আন্দোলনের পেছনে রয়েছে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, আবাসন সংকট, মূল্যস্ফীতি, সরকারি সেবায় বরাদ্দ কমানো এবং সরকারের নীতির প্রতি অসন্তোষের মতো অভিন্ন কারণ।

বর্তমানে ফ্রান্স ও আলবেনিয়ায় বিক্ষোভের কারণে সরকার বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। একের পর এক আন্দোলনের ঢেউয়ে দেশ দুটিতে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। তবে অন্যান্য দেশেও অর্থনৈতিক চাপ ও সরকারি নীতির বিরুদ্ধে অসন্তোষ থেকে বিক্ষোভ হচ্ছে।

ফ্রান্সে মূল্যস্ফীতি ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ নিয়ে ক্ষোভ

ফ্রান্সে সরকারি নীতির দুটি বিষয়কে কেন্দ্র করে ব্যাপক বিক্ষোভ শুরু হয়েছে। একটি হলো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে মানুষের ক্ষোভ। অন্যটি বিদ্যালয়ের পরিস্থিতি ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ কমানোর প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের আন্দোলন।

আইন অনুযায়ী, প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ আর নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। ফলে পরবর্তী নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তাঁর শাসনামলের অবসান ঘটবে।

গত মাসে প্যারিসে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর দাবিতে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ছোট পরিসরের স্থানীয় আন্দোলন শুরু হয়। পরে তা বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে সহিংস সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়। এতে অনেক এলাকায় শ্রেণি কার্যক্রমও ব্যাহত হয়েছে।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরঁ নুনেজ ফ্রান্স ২৪-কে জানান, ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার প্রতিবাদে দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে শুধু প্যারিসেই রাস্তায় নামেন ১ লাখ ১০ হাজার মানুষ।

বেলজিয়ামে শিক্ষা ব্যয় ও জীবনযাত্রার খরচ নিয়ে আন্দোলন

বেলজিয়ামেও সরকারি ব্যয় সংকোচনের পাশাপাশি পরিবারের খরচ বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ করছেন। বিশ্ববিদ্যালয় ও উচ্চশিক্ষায় ভর্তির বাড়তি ফি দিতে অনিচ্ছুক শিক্ষার্থীদের আন্দোলন পরে দেশজুড়ে জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে প্রতিবাদে রূপ নেয়।

গতকাল ব্রাসেলস ও লিয়েজে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান ব্যবহার করে।

বেলজিয়ামের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বার্নার্ড কুইন্তিন এসব ঘটনাকে সমাজকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে সংঘটিত ও বারবার ঘটতে থাকা সহিংসতা হিসেবে বর্ণনা করেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘দাঙ্গাকারী’ বলেও আখ্যা দেন।

পর্তুগালে সাশ্রয়ী আবাসনের দাবিতে মিছিল

পর্তুগালের রাজধানী লিসবনে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি ও সাশ্রয়ী আবাসনের সংকটের প্রতিবাদে হাজারো মানুষ মিছিল করেছেন।

লিসবনসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে ২০১৭ সালের পর থেকে বাড়ির দাম দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। নতুন ভাড়ার চুক্তিতেও ভাড়া প্রায় একই হারে বেড়েছে। ফলে তরুণ কর্মজীবী ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো আর্থিক চাপে পড়েছে।

অনেকের মতে, সংকট শুধু বাড়ি কেনার সামর্থ্য না থাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ভাড়া বাসায় থাকাও দিন দিন মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে যাচ্ছে।

ফ্রান্সের বিক্ষোভের সঙ্গে পর্তুগালের আন্দোলনের একটি পার্থক্য হলো, দেশটির মিছিলগুলো মূলত মজুরি, আবাসন এবং পরিবারের সাশ্রয়ী জীবনযাপনের দাবিকে কেন্দ্র করে হচ্ছে।

ইতালিতে কমেছে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা

ইউরোপের অন্যান্য দেশের মতো ইতালিতেও জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় অসন্তোষ তৈরি হয়েছে। মূল্যস্ফীতি ও দৈনন্দিন খরচ বৃদ্ধির বিপরীতে মজুরি স্থবির থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমছে।

মজুরি না বাড়া, মূল্যস্ফীতি এবং দৈনন্দিন ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাওয়ার প্রতিবাদে মিলানে সংঘর্ষের খবর পাওয়া গেছে। তবে ফ্রান্সের তুলনায় ইতালির বিক্ষোভের পরিসর ছিল ছোট।

আলবেনিয়ায় শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ, বাড়ছে দাবির পরিধি

বিশ্ববিদ্যালয়ের দুরবস্থা, উচ্চশিক্ষার ব্যয়, আর্থিক সহায়তার অভাব এবং স্নাতক হওয়ার পর কর্মসংস্থানের সুযোগ না থাকা নিয়ে আলবেনিয়ার শিক্ষার্থীরা সরকারের সমালোচনা করছেন।

গত ১৩ অক্টোবর রাজধানী তিরানায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের বাইরে বিক্ষোভ সহিংস রূপ নেয়। বিক্ষোভকারীরা মন্ত্রণালয়ের ভবন লক্ষ্য করে ইট ও কংক্রিটের টুকরা ছুড়লে পুলিশ কঠোর ব্যবস্থা নেয়।

পরে আন্দোলনকারীদের দাবির পরিধি বাড়তে থাকে। শিক্ষাব্যবস্থার সংকটের পাশাপাশি অসমতা, বেকারত্ব এবং ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তাঁরা।

স্নাতক শেষ করার পর অর্থনীতি তাঁদের কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তরুণ প্রজন্মের চাপের মুখে পড়েছে সরকার।

ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রতিবাদ

ভারতে ভোটার তালিকা সংশোধনের বিশেষ নিবিড় সংশোধন (স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন-এসআইআর) কার্যক্রমে কথিত অনিয়মের অভিযোগে বিরোধী দলগুলো ও তাদের সমর্থকেরা সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করছেন।

বিদেশে শিক্ষিত জনসংযোগ বিষয়ে স্নাতক এক ব্যক্তির নেতৃত্বাধীন নবগঠিত ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক গোষ্ঠী কক্রোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এসব কর্মসূচিতে ভূমিকা রাখছে। গোষ্ঠীটির কয়েকজন প্রকাশ্যে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীসহ দলটির নেতাদের সমর্থন জানিয়েছেন।

এর আগে মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের প্রতিবাদেও গোষ্ঠীটি বিক্ষোভ করেছিল। ওই ঘটনার পর শেষ পর্যন্ত কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানকে পদত্যাগ করতে হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছে ভারতের নির্বাচন কমিশন।

যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবিরোধী ‘নো কিংস’ সমাবেশ

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতাকারী ‘নো কিংস’ নেটওয়ার্কের উদ্যোগে দেশটির বিভিন্ন শহর ও জনপদে সমাবেশ হয়েছে। মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের আগাম ভোট দিতে উৎসাহিত করাও এসব কর্মসূচির লক্ষ্য ছিল।

আয়োজকেরা সমাবেশগুলোকে দলনিরপেক্ষ হিসেবে তুলে ধরেছেন। তবে ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সি নিয়ে অসন্তুষ্ট মানুষের প্রায় দুই বছর ধরে চলা ‘নো কিংস’ মিছিল ও বিক্ষোভের ধারাবাহিকতায় এসব কর্মসূচি আয়োজন করা হয়েছে।

আর্জেন্টিনায় উচ্চশিক্ষার ব্যয় নিয়ে বিক্ষোভ

এ সপ্তাহের শুরুতে আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনস আইরেসে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। বাজেট সংকোচনকারী প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইয়ের উচ্চশিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর নীতির প্রতিবাদে এ বিক্ষোভ হয়।

পার্লামেন্টের বাইরে বিশ্ববিদ্যালয়ের হাজারো শিক্ষার্থী ও কর্মী, ট্রেড ইউনিয়নপন্থী এবং বিরোধী দলের সমর্থকেরা বড় বিক্ষোভে অংশ নেন। তাঁদের মূল কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও ভিড় থেকে বেরিয়ে আসা মুখোশধারী কয়েক ডজন বিক্ষোভকারী পুলিশের দিকে পাথর ও অন্যান্য বস্তু ছোড়েন।

২০২৩ সালের শেষ দিকে মিলেই ক্ষমতায় আসার পর শিক্ষা খাতে অর্থায়নের সংকট নিয়ে এটি ছিল পঞ্চম বড় বিক্ষোভ। ২০২৫ সালের একটি আইন অনুসারে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আরও বেশি অর্থ বরাদ্দ দিতে সরকারকে বাধ্য করার বিষয়ে একাধিক আদালতের আদেশের পর এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়।

তুরস্কে পেনশন ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে ক্ষোভ

তুরস্কে টানা মূল্যস্ফীতির মধ্যে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও অপর্যাপ্ত পেনশনের প্রতিবাদে গত মাসে অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও শ্রমিক সংগঠনগুলো বিক্ষোভ করে।

মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকার সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করা এবং পরিবারের মৌলিক খরচ মেটানোর দাবিতে পেনশনভোগীরা রাজধানী আঙ্কারায় সাংবিধানিক আদালতের বাইরে জড়ো হন।

বিক্ষোভের সময় ৬০ বছর বয়সী অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা আলী সেকেরোগলু তুরস্কের পতাকা গায়ে জড়িয়ে এবং ‘টাকার জন্য নয়, আমাদের সম্মানের জন্য’ লেখা প্ল্যাকার্ড হাতে নিজের আর্থিক সংকট ও দুই বেকার ছেলের কথা বলার পর আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে নিজেকে গুলি করেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভের ধরন ও তাৎক্ষণিক কারণ আলাদা হলেও জীবনযাত্রার ব্যয়, কর্মসংস্থানের অনিশ্চয়তা, শিক্ষা ও আবাসন সংকট এবং সরকারি নীতির প্রতি অসন্তোষ অনেক আন্দোলনের সাধারণ বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে।

সূত্র: এনডিটিভি

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button