পোল্যান্ডে বন্দুকধারীর হামলায় নিহত ৬, সন্দেহভাজনের বাড়িতে মিলল আরও ৩ মরদেহ

পোল্যান্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর ক্রাকোর ব্যস্ত পর্যটনকেন্দ্রে বন্দুকধারীর হামলায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৫ জন। উগ্র ডানপন্থি মতাদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে ২৫ বছর বয়সী এক ব্যক্তি এ হামলা চালিয়েছেন বলে ধারণা করছে দেশটির কর্তৃপক্ষ। এদিকে সন্দেহভাজনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, নিহত তিনজনই তার পরিবারের সদস্য। খবর বিবিসির।
শনিবার (৭ নভেম্বর) স্থানীয় সময় বেলা ৩টার কিছু আগে ক্রাকোর ঐতিহাসিক মেইন মার্কেট স্কয়ারে এ হামলার ঘটনা ঘটে। পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় এই চত্বরে সামরিক বাহিনীর আদলে পোশাক ও অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এক ব্যক্তি গাড়ি নিয়ে প্রবেশ করেন। এরপর তিনি এলোপাতাড়ি গুলি চালাতে শুরু করেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
হামলাকারীর গুলিতে ঘটনাস্থলেই চার নারী ও দুই পুরুষ নিহত হন। নিহতদের মধ্যে তিনজন পোলিশ নাগরিক, একজন ব্রিটিশ নাগরিক এবং বাকি দুজনের পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে শনাক্ত করা যায়নি। প্রায় তিন মিনিট ধরে চলা এ হামলায় আশপাশের দোকানের কাচ ভেঙে যায়। একটি ট্রামেও গুলি চালানো হয়। প্রাণ বাঁচাতে ছুটোছুটি শুরু করেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটকেরা। ঘটনাস্থলে বিভিন্ন দোকানের টেবিল উল্টে পড়ে থাকতে দেখা যায়। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল মানুষের ফেলে যাওয়া ব্যক্তিগত জিনিসপত্র।
পরে সশস্ত্র পুলিশ সদস্যরা গাড়িটি ধাওয়া করেন। একপর্যায়ে গাড়িটি দুর্ঘটনার কবলে পড়লে পুলিশ ও হামলাকারীর মধ্যে গুলিবিনিময় হয়। এতে সন্দেহভাজন ব্যক্তি আহত হন। আহত হন দুই পুলিশ সদস্যও। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তাদের একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক, অন্যজনের আঘাত তুলনামূলক কম।
পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক আহত দুই পুলিশ সদস্যের নাম প্রকাশ করেছেন। তারা হলেন সিনিয়র কনস্টেবল ইয়াকুব কুলিক ও সিনিয়র কনস্টেবল আরতুর মোরানস্কি। টাস্ক বলেন, তারা অনেক মানুষের জীবন বাঁচিয়েছেন। এ দুই পুলিশ সদস্যকে ‘প্রকৃত বীর’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
হামলার পর আহত ২৫ বছর বয়সী পোলিশ সন্দেহভাজনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। অস্ত্রোপচারের জন্য তাকে প্রস্তুত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে তার নাম এখনো প্রকাশ করা হয়নি। হামলার সময় তার কাছে সামরিক মানের অস্ত্র ছিল বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। যদিও তিনি পোলিশ সশস্ত্র বাহিনীর সদস্য ছিলেন না। তার ব্যবহৃত গাড়ি থেকে আরও অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা হয়েছে।
পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মারচিন কিয়েরভিনস্কি বলেন, সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছে, সন্দেহভাজন ব্যক্তি উগ্র ডানপন্থি মতাদর্শে প্রভাবিত ছিলেন এবং তার মধ্যে অতিজাতীয়তাবাদী মনোভাব ছিল। দেশটির আরেক মন্ত্রীও তাকে ‘অতিজাতীয়তাবাদী’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
এদিকে ক্রাকো থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে সন্দেহভাজনের বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে আরও তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। নিহতদের মধ্যে দুজন নারী ও একজন পুরুষ। তাদের সন্দেহভাজনের নিকটাত্মীয় বলে মনে করার যথেষ্ট কারণ রয়েছে বলে জানান তিনি।
টাস্ক বলেন, ‘এখন পর্যন্ত পোল্যান্ডে আমরা এ ধরনের ভয়াবহ সন্ত্রাসী ঘটনার মুখোমুখি হইনি। ক্রাকোতে মানুষের প্রাণের ওপর চালানো এই নিষ্ঠুর হামলাকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডই বলতে হবে।’
হামলার সঙ্গে জড়িত সন্দেহভাজনের সম্ভাব্য সহযোগীদের আটক করা হবে বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। পাশাপাশি এ বিষয়ে কারও কাছে কোনো তথ্য থাকলে তা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
ঘটনার পর শনিবার সন্ধ্যায় ক্রাকো শহরজুড়ে ব্যাপকসংখ্যক সশস্ত্র পুলিশ মোতায়েন করা হয়। রাজধানী ওয়ারশসহ দেশের অন্যান্য এলাকাতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
পোল্যান্ডের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, আহত ১৫ জনের মধ্যে দুজন পুলিশ সদস্য এবং পাঁচজন বিদেশি নাগরিক রয়েছেন। আহত বিদেশিদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রিয়া, রাশিয়া, জার্মানি ও পর্তুগালের নাগরিক আছেন।
ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, হামলার সময় পুরো এলাকায় আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে। ক্রাকোতে পড়াশোনা করা ২৪ বছর বয়সী পোলিশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী সেজারি বলেন, প্রথমে তিনি বিকট শব্দ শুনলেও সেগুলো যে গুলির শব্দ, তা বুঝতে পারেননি। পরে রাস্তায় চারটি মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে বিষয়টি বুঝতে পারেন।
তিনি বলেন, ‘তখনো আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছিলাম। অনেক মানুষ চিৎকার করছিলেন।’ এ সময় রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকা একজনকে বাঁচাতে আরেকজনকে কৃত্রিম শ্বাসপ্রশ্বাস দেওয়ার চেষ্টা করতেও দেখেছেন তিনি।
যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল থেকে আসা ক্যাটলিন শ্যাসবি জানান, হোটেলের কক্ষ থেকে তিনি গুলির শব্দ শুনেছিলেন। পরে পুলিশ রাস্তা অবরুদ্ধ করে ফেললে তাকে ভেতরে নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়।
আরেক প্রত্যক্ষদর্শী পোলিশ সংবাদমাধ্যম ইনটারিয়াকে জানান, গাড়ির চালকের পাশের জানালা দিয়ে গুলি ছোড়া হচ্ছিল এবং গাড়ি থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল। প্রাণ বাঁচাতে তিনি মেইন মার্কেট স্কয়ারের পুলিশ স্টেশনে আশ্রয় নেন। সেখানে গিয়ে দেখেন, অনেক মানুষ মেঝেতে শুয়ে আত্মগোপন করে আছেন।
হামলার ঘটনায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম শোক প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, ক্রাকোর ভয়াবহ গুলির ঘটনায় তিনি মর্মাহত ও শোকাহত। নিহতদের পরিবারের সদস্য, আহত ব্যক্তি এবং সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্ত সবার প্রতি সমবেদনা জানান তিনি। একই সঙ্গে পোল্যান্ডের জনগণের পাশে থাকার কথা জানায় যুক্তরাজ্য।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস ঘটনাটিকে এমন এক ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যার প্রভাব পোল্যান্ডের সীমানা ছাড়িয়ে বহুদূর অনুভূত হবে। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এড মিলিব্যান্ডও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শোক জানিয়ে নিহতদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা প্রকাশ করেছেন।
হামলার পর যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্র দপ্তর পোল্যান্ডে ভ্রমণসংক্রান্ত পরামর্শ হালনাগাদ করেছে। ওই এলাকায় অবস্থানরত ব্রিটিশ নাগরিকদের স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তথ্যসূত্র: যমুনা টিভি


