
রংপুর মহানগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকায় একই পরিবারের চারজনকে হত্যার ঘটনায় সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধ নামে দুই যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া খেজুরের বিচি, অর্ধেক কামড়ানো শসা, পোড়ানো অলংকারসহ বিভিন্ন আলামত এবং স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাদের শনাক্ত করা হয়। খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
রোববার (২৩ আগস্ট) সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান রংপুর মহানগর পুলিশ কমিশনার (ডিআইজি) মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ।
পুলিশ কমিশনার জানান, ঘটনাস্থলে ইয়াবা সেবনের আলামত পাওয়া যায়। তদন্তে পুলিশের ধারণা হয়, হত্যাকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তিরা সেখানে ইয়াবা সেবন ও খেজুর খেয়েছিল। পরে খেজুরের বিচি ডিএনএ পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়।
তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর আসামিরা ফ্রিজ থেকে শসা বের করে খেয়েছিল। ঘটনাস্থলে পাওয়া অর্ধেক কামড়ানো শসার সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের বক্তব্যের মিল পাওয়া গেছে। এরপর তারা গোসল করে এবং একটি চুরি করা অলংকার আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করে সেটি স্বর্ণ কি না, তা যাচাই করার চেষ্টা করে।
পুলিশের মতে, এসব আলামত বিশ্লেষণ করেই তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার মুগ্ধ (২৩) ও সিদ্ধার্থ (১৯) পরস্পরের মামাতো ভাই এবং নিহত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তীর প্রতিবেশী। তারা পরিবারের চারজনকে হত্যার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মুগ্ধের বাবা কানুদাস এবং সিদ্ধার্থের বাবা বিনয়চন্দ্র দাস। তাদের বাড়ি রংপুর কোতোয়ালি থানার মাছুয়াপাড়া এলাকায়।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, গণপতি চক্রবর্তী এলাকায় সম্মানিত ব্যক্তি ছিলেন। তার সঙ্গে গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের পরিবারের কোনো কলহ বা বিরোধ ছিল না।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে দুই মামাতো ভাই পাশের ভবনের ওপর দিয়ে গণপতি চক্রবর্তীর বাড়ির ছাদে যায়। সেখানে তারা ইয়াবা সেবন করছিল।
এ সময় শব্দ শুনে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে তাদের সেখানে বসে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করেন। তিনি খালি গায়ে ও কাঁধে গামছা নিয়ে ছাদে গিয়েছিলেন। একপর্যায়ে তিনি তাদের চ্যালেঞ্জ করলে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ না করার জন্য তাকে হত্যা করা হয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পরে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করা হয়।
পুলিশ জানায়, গ্রেপ্তার সিদ্ধার্থ একটি স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করেন। হত্যাকাণ্ডের পর বাড়িতে থাকা একটি অলংকার চুরি করে সেটি আগুনে পুড়িয়ে পরীক্ষা করেন তিনি। অলংকারটি স্বর্ণের কি না, তা যাচাই করতেই এমনটি করা হয়েছিল বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, ঘটনাস্থলে পোড়ানো অলংকারের আলামত পাওয়ার পর তদন্তকারীরা ধারণা করেছিলেন, স্বর্ণের কাজে অভিজ্ঞ কেউ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারে। পরে সিদ্ধার্থের স্বর্ণের দোকানে কারিগর হিসেবে কাজ করার তথ্য পাওয়ায় সেই ধারণার সঙ্গে মিল পাওয়া যায়।
হত্যাকাণ্ডকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে আসামিরা ঘরের জিনিসপত্র ইচ্ছাকৃতভাবে এলোমেলো করে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
এ ছাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে দুটি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। পুলিশ বলছে, আঙুলের ছাপ মুছে ফেলার উদ্দেশ্যেই ফোন দুটি এভাবে রাখা হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের খবর পাওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান শুরু করে। একপর্যায়ে সিদ্ধার্থ ও মুগ্ধকে আটক করা হয়।
পুলিশ জানায়, তাদের একজন পুলিশের অভিযান সম্পর্কে জানতে পেরে রেশম উন্নয়ন বোর্ডের তুতবাগান এলাকায় লুকিয়ে ছিল। পরে পাশের দখীগঞ্জ শ্মশান এলাকা থেকে তাকে আটক করা হয়।
রংপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম নাজমুল কাদের বলেন, ঘটনাস্থল থেকে পাওয়া আলামতের ভিত্তিতে স্থানীয়ভাবে খোঁজ নেওয়া হয়। পরে মাদকসেবীদের বিষয়ে স্থানীয় সোর্সের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং নিহতদের স্বজনদের দেওয়া তথ্য মিলিয়ে আসামিদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়।
আসামিদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন ওসি এ কে এম নাজমুল কাদের।
তিনি বলেন, পরীক্ষার ফল ও তদন্তে পাওয়া অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে পরবর্তী আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা হবে।
নিহতরা হলেন-রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী বালা (৫০), মেয়ে আগামী চক্রবর্তী (২৫) এবং ছেলে আয়ুশ চক্রবর্তী (১২)।
গণপতি চক্রবর্তী গত বছরের ডিসেম্বরে রংপুর জিলা স্কুল থেকে শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেন। পরে রংপুর সমবায় মার্কেটে একটি হোমিওপ্যাথি চেম্বারে নিয়মিত চিকিৎসাসেবা দিতেন।
তার মেয়ে আগামী চক্রবর্তী কারমাইকেল কলেজের ইংরেজি বিভাগের ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী ছিলেন। সম্প্রতি তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেন। ১২ বছর বয়সী ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী রংপুর জিলা স্কুলের পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত।
তথ্যসূত্র: যুগান্তর



