বাংলাদেশ
প্রধান খবর

সতর্কতা সত্ত্বেও গত ছয় মাসে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে ১০ জন নিহত কেন?

ভারত থেকে কথিত ‘পুশ ইন’ ঠেকাতে কয়েক মাস ধরেই সীমান্তে নজরদারি ও সতর্কতা বাড়ানোর কথা বলছে বাংলাদেশ সরকার। তবে এসব পদক্ষেপের পরও সীমান্তে প্রাণহানি থামেনি।

মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে বিএসএফ সংশ্লিষ্ট অন্তত ২১টি সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এসব ঘটনায় মোট ১০ জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে সাতজন গুলিতে এবং তিনজন শারীরিক নির্যাতনের কারণে প্রাণ হারিয়েছেন।

অন্যদিকে, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) জানিয়েছে, একই সময়ে বিভিন্ন সীমান্ত সহিংসতায় বিএসএফের হাতে ছয়জন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন ভারতীয় নাগরিক এবং বাকিরা বাংলাদেশি।

২০২৪ সালের আগস্টে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়। এরপর সীমান্তে ‘পুশ ইন’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ে এবং নজরদারিও জোরদার করা হয়। সরকার সীমান্তে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানের কথাও জানিয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের মতে, নিরাপত্তা জোরদারের ঘোষণা এলেও সীমান্ত পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন এখনো হয়নি।

সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গের বেশকিছু সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে ‘পুশ ইন’ চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে।ছবি: সংগৃহীত

ছয় মাসে কোথায় কত প্রাণহানি

আসকের তথ্যে বলা হয়েছে, গুলিতে নিহত সাতজনের মধ্যে সিলেট বিভাগে তিনজন, রংপুরে দুইজন এবং চট্টগ্রামে দুইজন ছিলেন। শারীরিক নির্যাতনে নিহত তিনজনের মধ্যে রাজশাহী বিভাগে দুজন এবং রংপুর বিভাগে একজন।

একই সময়ে সীমান্ত সহিংসতায় আহত হয়েছেন আরও ১০ জন। তাদের মধ্যে চট্টগ্রামে পাঁচজন, খুলনা ও রংপুরে দুজন করে এবং রাজশাহীতে একজন আহত হন।

হতাহতের ঘটনাগুলো ঘটেছে ঝিনাইদহ, চুয়াডাঙ্গা, সাতক্ষীরা, মৌলভীবাজার, সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, ঠাকুরগাঁও এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়াসহ বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায়।

এ ছাড়া রংপুর বিভাগে একজনকে অপহরণ বা আটকের ঘটনাও নথিভুক্ত করেছে আসক।

আগের বছরের তুলনায় কী চিত্র

আসকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে সীমান্তে নিহত হন ১৫ জন এবং আহত হন ২৯ জন। ২০২৪ সালের একই সময়ে নিহত ছিলেন ১৪ জন, আহত ১১ জন। ২০২৩ সালে নিহত হন ১১ জন, ২০২২ সালে পাঁচজন, ২০২১ সালে ছয়জন এবং ২০২০ সালের প্রথম ছয় মাসে সর্বোচ্চ ২৬ জন নিহত হন।

কেন থামছে না সীমান্ত হত্যা

নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলাম মনে করেন, সীমান্তের প্রতিটি ঘটনা একই ধরনের নয়। কেউ গবাদিপশু আনতে গিয়ে, কেউ আত্মীয়দের সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে, আবার কেউ সীমান্তবর্তী জমিতে কাজ করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন।

তার মতে, সীমান্তে নজরদারি বাড়ানোর কারণে চলতি বছরের প্রথমার্ধে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি।

তিনি বলেন, একসময় গবাদিপশু চোরাচালান ও ফেনসিডিল পাচার ছিল সীমান্ত সংঘাতের বড় কারণ। বর্তমানে সেসব কমলেও বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন কারণে সংঘর্ষ ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে।

মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের মতে, ‘পুশ ইন’ ঠেকাতে কড়াকড়ি বাড়লেও চার হাজার কিলোমিটারের বেশি দীর্ঘ সীমান্তে সর্বত্র একই মাত্রার নজরদারি সম্ভব নয়। টহলের ফাঁকেই অনেক মানুষ সীমান্ত অতিক্রম করেন।

তিনি বলেন, সীমান্তবর্তী মানুষের পারিবারিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বহু পুরোনো। অনেক ক্ষেত্রেই আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করা, চিকিৎসা বা দৈনন্দিন প্রয়োজনেও মানুষ সীমান্ত পার হওয়ার চেষ্টা করেন।

তার অভিযোগ, অনেক ক্ষেত্রে চোরাচালানের অভিযোগ দেখিয়ে গুলি চালানো হয়। অথচ সন্দেহভাজনদের গুলি না করে আটক করে আইনের আওতায় আনা সম্ভব।

নূর খান লিটনের মতে, চলতি বছরে হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমলেও এটিকে পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি বলা যাবে না। তার ভাষায়, দুই দেশের রাজনৈতিক সম্পর্ক ভালো বা খারাপ-উভয় সময়েই সীমান্ত হত্যা ঘটেছে। তাই এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানে কার্যকর কূটনৈতিক উদ্যোগ এবং সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় মানবাধিকারভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন।

তথ্যসূত্র: বিবিসি বাংলা

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button