যুক্তরাজ্যে দারিদ্র্য ও সরকারি সহায়তায় শীর্ষে বাংলাদেশী অভিবাসীরা
গবেষণা বলছে, ৫৩ শতাংশ বাংলাদেশী দারিদ্র্যসীমার নিচে; ভিসা অপব্যবহারে বাড়ছে নতুন সংকট

যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ও সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরতার ক্ষেত্রে শীর্ষ অবস্থানে রয়েছেন বাংলাদেশী অভিবাসীরা। সাম্প্রতিক বিভিন্ন গবেষণা প্রতিবেদন ও দেশটির সরকারি পরিসংখ্যান থেকে এমন উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট গবেষকদের মতে, নিম্ন আয়ের চাকরিতে আটকে থাকা, পরিবারের আকার তুলনামূলক বড় হওয়া এবং লন্ডনের মতো ব্যয়বহুল শহরে বসবাসের চাপ বাংলাদেশী কমিউনিটির অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করছে। একই সঙ্গে প্রযুক্তিগত ও পেশাগত দক্ষতার ঘাটতির কারণে অনেকেই মানসম্পন্ন চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছেন না।
দারিদ্র্যে শীর্ষে বাংলাদেশীরা
যুক্তরাজ্যের দাতব্য ও সামাজিক নীতি গবেষণা সংস্থা জোসেফ রাউন্ট্রি ফাউন্ডেশন (জেআরএফ)–এর সাম্প্রতিক এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাজ্যে বসবাসরত বাংলাদেশীদের ৫৩ শতাংশই দারিদ্র্যের শিকার। যেখানে দেশটির সামগ্রিক গড় দারিদ্র্যের হার ২১ শতাংশ।
তুলনামূলকভাবে শ্বেতাঙ্গ পরিবারগুলোর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ১৮ শতাংশ। অর্থাৎ শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় বাংলাদেশী পরিবারগুলোর দারিদ্র্যের হার প্রায় ২ দশমিক ৯ গুণ বেশি।
অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে-
- পাকিস্তানি পরিবার: ৪৯ শতাংশ
- চীনা পরিবার: ৩৬ শতাংশ
- ভারতীয় পরিবার: ২৬ শতাংশ
চরম দারিদ্র্যে প্রতি চারজনের একজন
চরম দারিদ্র্যের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশীরা শীর্ষে। যেসব পরিবারের আয় রাষ্ট্রীয় গড় আয়ের ৪০ শতাংশের কম, সেই চরম দারিদ্র্যের হার বাংলাদেশী পরিবারে প্রায় ২৩ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি চারজন বাংলাদেশীর একজন চরম দারিদ্র্যের শিকার।
অন্যদিকে,
- শ্বেতাঙ্গ পরিবারে চরম দারিদ্র্য: ৮ শতাংশ
- পাকিস্তানি পরিবারে: ২০ শতাংশ
- অন্যান্য এশীয় পরিবারে: ২০ শতাংশ
বাংলাদেশী শিশুদের ভয়াবহ বাস্তবতা
সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র দেখা গেছে শিশুদের ক্ষেত্রে। গবেষণা অনুযায়ী,
- শ্বেতাঙ্গ শিশুদের দারিদ্র্যের হার: ২৪ শতাংশ
- বাংলাদেশী শিশুদের দারিদ্র্যের হার: ৬৫ শতাংশ
এর মধ্যে অন্তত ২৮ শতাংশ বাংলাদেশী শিশু চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেড়ে উঠছে। দীর্ঘমেয়াদি চরম দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশীরা শ্বেতাঙ্গদের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি।
কর্মসংস্থান ও পরিবার কাঠামো বড় কারণ
২০১১ থেকে ২০২৩ সালের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়,
- ১১ শতাংশ বাংলাদেশী পরিবার দীর্ঘমেয়াদি চরম দারিদ্র্যের শিকার,
- যেখানে শ্বেতাঙ্গদের ক্ষেত্রে এ হার মাত্র ২ শতাংশ।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ৬৮ শতাংশ বাংলাদেশী কর্মক্ষম প্রাপ্তবয়স্ক এমন পরিবারে বাস করেন, যেখানে সব সদস্য কাজে নিয়োজিত নন। শ্বেতাঙ্গদের মধ্যে এ হার ৩৭ শতাংশ।
বড় পরিবার (তিন বা ততোধিক সন্তান) এবং লন্ডনের মতো শহরে উচ্চ আবাসন ব্যয়ও দারিদ্র্য বাড়াচ্ছে।
‘মিনিমাম ওয়েজে আটকে আছে বাংলাদেশীরা’
যুক্তরাজ্যে স্কিলড ওয়ার্কার ভিসায় কর্মরত বাংলাদেশী তরুণ আহমেদ শরিফ বলেন,
“যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ এখনো মিনিমাম ওয়েজনির্ভর চাকরিতে আটকে আছে। ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতার ঘাটতি, পেশাগত নেটওয়ার্কের অভাব ও ঝুঁকি নিতে অনীহা-এসব কারণে তারা এগোতে পারছে না।”
সরকারি সহায়তায়ও শীর্ষে বাংলাদেশীরা
যুক্তরাজ্য সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে ৫২ শতাংশ বাংলাদেশী কোনো না কোনো সরকারি সহায়তা গ্রহণ করেছে-যা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় সর্বোচ্চ।
তুলনামূলকভাবে-
- পাকিস্তানি: ৪৮ শতাংশ
- ভারতীয়: ৩৯ শতাংশ
- চীনা: ২৫ শতাংশ
- কৃষ্ণাঙ্গ: ৪০ শতাংশ
যুক্তরাষ্ট্রেও একই চিত্র, বাড়ছে কড়াকড়ি
যুক্তরাষ্ট্রেও বাংলাদেশী অভিবাসীদের সরকারি সুবিধা গ্রহণের হার বেশি। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ৫৪ দশমিক ৮ শতাংশ বাংলাদেশী পরিবার সরকারি সহায়তা গ্রহণ করে।
এর পরপরই যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ ২৫টি দেশকে ভিসা বন্ড শর্তযুক্ত দেশের তালিকায় যুক্ত করে। এসব দেশের নাগরিকদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের আগে সর্বোচ্চ ১৫ হাজার ডলার বন্ড জমা দিতে হবে।
অভিবাসনসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, যুক্তরাজ্যও এ ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে।
ভিসা অপব্যবহার বাড়াচ্ছে সংকট
প্রবাসীদের মতে, বাংলাদেশী কমিউনিটির সবচেয়ে বড় ক্ষতি করছে ভিসা ব্যবস্থার অপব্যবহার। বিশেষ করে-
- স্টুডেন্ট ভিসায় এসে রাজনৈতিক আশ্রয় আবেদন
- কেয়ার ওয়ার্কার সেক্টরে ভুয়া স্পন্সরশিপ
- অসাধু এজেন্সির দৌরাত্ম্য
এর ফলে ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি, লাইসেন্স বাতিল ও ডিপোর্টেশনের ঘটনা বাড়ছে।
‘এগুলো অভিবাসনবিরোধী রাজনৈতিক হাতিয়ার’
তবে এসব তথ্যকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে মনে করেন রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিট (রামরু)-এর প্রতিষ্ঠাতা তাসনিম সিদ্দিকী।
তিনি বলেন,
“পশ্চিমা দেশগুলোতে অভিবাসনবিরোধী যে রাজনৈতিক ঢেউ চলছে, এসব রিপোর্ট তারই অংশ। ‘৫৩ শতাংশ বাংলাদেশী সরকারি সহায়তা নেয়’-এমন তথ্য দিয়ে বিদেশী-ভীতি তৈরি করা হচ্ছে।”
তিনি আরও বলেন,
“৪০–৫০ বছর ধরে বসবাস করে যারা নাগরিকত্ব পেয়েছেন, তারা আর ‘মাইগ্র্যান্ট’ নন। নাগরিকদের দারিদ্র্যের দায় সংশ্লিষ্ট রাষ্ট্রের সরকারের।”
তথ্যসূত্র: বণিক বার্তা



