আদমদিঘী উপজেলাবগুড়া জেলা
প্রধান খবর

অটো রাইস মিলের দাপটে আদমদীঘিতে বন্ধ ১৪২ হাসকিং চাতাল

নিজস্ব প্রতিবেদক: শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলায় আধুনিক অটো রাইস মিলের ব্যাপক বিস্তারের ফলে এক সময়ের জমজমাট হাসকিং চাতাল শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে।

উৎপাদন সক্ষমতায় পিছিয়ে পড়া, ধানের উচ্চমূল্য, শ্রমিক সংকট ও মূলধনের অভাবে উপজেলায় ইতোমধ্যে ১৪২টি হাসকিং চাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। এতে কর্মহীন হয়েছেন হাজারো শ্রমিক, পাশাপাশি হারিয়ে যেতে বসেছে এলাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যবাহী চালকল শিল্প।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৯০-এর দশকে আদমদীঘিতে প্রায় ২৮০টি হাসকিং চাতাল চালু ছিল। সময়ের ব্যবধানে অর্ধেকেরও বেশি মিল বন্ধ হয়ে বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ১৩৮টি। বন্ধ হয়ে যাওয়া অনেক চাতালের জায়গায় গড়ে উঠেছে বসতবাড়ি, দোকানপাট কিংবা গরু, হাঁস-মুরগি ও ছাগলের খামার। আদমদীঘি সদর, সান্তাহার, নসরতপুর, চাঁপাপুর, কুন্দগ্রাম ও ছাতিয়ানগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় এমন চিত্র দেখা গেছে।

১৯৮০-এর দশকে এ অঞ্চলে ধান সিদ্ধ ও মাড়াইয়ের জন্য বয়লারভিত্তিক হাসকিং মিল বা চাতাল গড়ে ওঠে। লাভজনক এ ব্যবসাকে কেন্দ্র করে একসময় উপজেলাজুড়ে প্রায় ৩০০টি চালকল প্রতিষ্ঠিত হয় এবং হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। এ ধারাবাহিকতায় দেশের অন্যতম বৃহৎ খাদ্য সংরক্ষণ কেন্দ্র সান্তাহার সিএসডি ও সাইলোও এ এলাকায় গড়ে ওঠে।

তবে ২০০০ সালের পর থেকে উপজেলায় অটো রাইস মিল স্থাপনের প্রবণতা বাড়তে থাকে। আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর এসব মিলের সঙ্গে উৎপাদন সক্ষমতায় প্রতিযোগিতা করতে না পেরে একের পর এক বন্ধ হয়ে যেতে থাকে ঐতিহ্যবাহী হাসকিং চাতাল।

চালকল মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, একটি অটো রাইস মিল প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন ধান প্রক্রিয়াজাত করতে সক্ষম। বিপরীতে একটি হাসকিং চাতালে দৈনিক ১০ টনের বেশি ধান মাড়াই করা সম্ভব হয় না। উৎপাদন সক্ষমতার এই বিশাল ব্যবধানের কারণে বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে মূলধন হারিয়েছেন অনেক চাতাল মালিক।

একসময় এসব হাসকিং চাতালে প্রায় সাত হাজার নারী-পুরুষ কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। মিলগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় তাদের অনেকেই কর্মহীন হয়ে অন্য পেশায় যুক্ত হতে বাধ্য হয়েছেন।

আদমদীঘির অটো রাইস মিল ব্যবসায়ী মোত্তাকিন তালুকদার বলেন, “আমারও আগে হাসকিং চাতাল ছিল, বর্তমানে অটো রাইস মিল রয়েছে। ধানের দাম বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকটের কারণে এখনো টিকে থাকতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একটি হাসকিং চাতালে প্রতিদিন প্রায় ১৪০ বস্তা ধান লাগে, অন্যদিকে একটি অটো রাইস মিলে প্রতিদিন তিন হাজার মেট্রিক টনেরও বেশি ধান প্রক্রিয়াজাত করা হয়। উৎপাদন সক্ষমতার এই পার্থক্যের কারণেই অনেক হাসকিং মিল বন্ধ হয়ে গেছে।”

চালকল মালিক মতিউর রহমান বলেন, “নানা কারণে আমরা স্বয়ংক্রিয় চালকলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছি না। সবচেয়ে বড় কারণ হলো চাল উৎপাদনের ব্যয় তুলনামূলক অনেক বেশি।”

খাদ্য বিভাগ জানিয়েছে, চলতি ইরি-বোরো মৌসুমে আদমদীঘিতে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ১ হাজার ১৯৭ মেট্রিক টন এবং চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ১৫ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন। চলতি মৌসুমে সরকার নির্ধারিত শতভাগ ধান ও চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের আশা করছে বিভাগটি।

আদমদীঘি উপজেলা খাদ্য কর্মকর্তা আবুল বাশার বলেন, “স্বয়ংক্রিয় চালকলের সংখ্যা বৃদ্ধি, ধানের মূল্য বৃদ্ধি, মূলধন সংকট এবং বাজার প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়াসহ বিভিন্ন কারণে সাধারণ হাসকিং চালকলগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।”

ব্যবসায়ীদের মতে, একসময় এলাকার অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানের অন্যতম ভিত্তি ছিল হাসকিং চাতাল শিল্প। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর চালকলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে শতবর্ষের এই শিল্প আজ বিলুপ্তির পথে। তাদের দাবি, ঐতিহ্যবাহী চালকল শিল্প টিকিয়ে রাখতে সরকারি নীতিগত সহায়তা, সহজ শর্তে ঋণ এবং আধুনিকায়নের উদ্যোগ জরুরি।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button