
রিপন দাস, বগুড়াঃ
তোরা আইলি বসেক, আমি একটু খেয়ে নেই, তারপর যাচ্ছি। উঠানে দাঁড়িয়ে বই-খাতা গুছিয়ে নিচ্ছিল সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী ফুলি (ছদ্মনাম)। এ দিকে সহপাঠিরা তাড়া দিচ্ছিল, “কই ফুলি, তাড়াতাড়ি কর। দুই মিনিটও লাগবে না স্কুলে যেতে, এত তাড়াতাড়ি করিস ক্যান তোরা?” হেসেই জবাব দেয় কিশোরী। “মা, আমি স্কুলে গেলাম।” মা তখন যেন হঠাৎ বললেন, “যা, আজ গেলে কাল আর স্কুলে যাওয়া হবে না। তাড়াতাড়ি আসিস।”
কেন? কাল তোরে দেখতে কুটুম আসবে, পাবনা থেকে। কিসের কুটুম? বাড়িতে আসলেই বুঝবি কিসের। তুই যা। অনেক কাজ, তোর সঙ্গে এত কথা কওয়ার সময় নাই। সেদিন হয়তো ফুলি বুঝতে পারেনি, স্কুলে যাওয়ার সেই বিদায়ই ছিল তার শৈশবের শেষ সকাল।

পরদিন পাবনার চাটমোহর থেকে কয়েকজন লোক আসে তাকে দেখতে। হঠাৎ করেই বিয়ের লোকজন বাড়িতে হাজির হওয়ায় পাশের কয়েকটি পরিবার আপত্তি জানায়। কিন্তু রাতের আঁধারেই নিজেদের সিদ্ধান্তে ছোট্ট মেয়ের বিয়ে চূড়ান্ত করেন মা-বাবা।
তাদের একটাই কথা-“আমার মেয়ে, আমরা বিয়ে দেব। তার জন্য গাঁও ধরে শুনতে যাবো কিসের ঠ্যাকা?” সেই কথার পর আর কেউ মুখ খোলেনি।
ফুলিরও কিছু বলার সুযোগ হয়নি। প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত নিয়মিত পড়াশোনা করা মেয়েটি বুঝে গিয়েছিল, তার ইচ্ছার কোনো মূল্য নেই। মায়ের কঠোরতা আর বাবার সিদ্ধান্তের সামনে প্রতিবাদ করার সাহসও হয়নি। অল্প কিছু দেনমোহর ও পারিবারিক লেনদেনের মধ্যেই শেষ হয়ে যায় তার শৈশব।
মাত্র ১৩ বছর বয়সে বিয়ে। দেড় বছরের মাথায় জন্ম নেয় এক ছেলে সন্তান। কিন্তু মাতৃত্বের ভার বহনের মতো শারীরিক কিংবা মানসিক প্রস্তুতি ছিল না তার। সন্তান জন্মের কিছুদিন পর থেকেই ফুলির শারীরিক ও মানসিক অবস্থার অবনতি ঘটে। বর্তমানে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ। সংসারের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারেন না, সন্তানের প্রতিও স্বাভাবিক যত্ন নিতে পারেন না।
১২, ১৩ কিংবা ১৪ বছর- এই বয়সে হাতে থাকার কথা বই-খাতা, ক্লাসের রুটিন আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন। কেউ সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী, কেউ অষ্টম শ্রেণিতে। কেউ ডাক্তার হতে চেয়েছিল, কেউ শিক্ষক, কেউবা শুধু পড়াশোনা চালিয়ে যেতে। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো থেমে গেছে বিয়ের পিঁড়িতে।

বগুড়ার শেরপুর উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক বাল্যবিয়ের ঘটনা ঘটেছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কিশোরীদের মতামতের কোনো মূল্য নেই। পরিবারই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, পরিবারই বিয়ে দিয়েছে।
একই উপজেলার আরও একটি দরিদ্র হিন্দু পরিবারের ১৩ বছরের কিশোরী পরিণতিও একই। সংসারের অভাব, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা আর “ভালো পাত্র” পাওয়ার যুক্তিতে ধারদেনা করে মেয়ের বিয়ে দেন বাবা-মা। পাত্রপক্ষের বিশেষ কোনো দাবি ছিল না। তাই বড় আয়োজন ছাড়াই সম্পন্ন হয় বিয়ে। দুই-তিন বছরের মধ্যে তাদের সংসারে জন্ম নেয় একটি ছেলে সন্তান। তখন মেয়েটির বয়স মাত্র ১৫। এই বয়সে সন্তানের মা হওয়া ওই কিশোরীর পক্ষে নিজের সন্তানকে যথাযথভাবে লালন-পালন করাই কঠিন হয়ে পড়ে।
পরিবারের সদস্যরা বলেন, সে নিজেই এখনও শিশু; তাই সন্তানের যত্ন নেওয়ার মতো অবস্থা তার নেই আর সে কীভাবে সংসারের দায়িত্ব নেবে?”
স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনার প্রায় সব ক্ষেত্রেই মেয়েদের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছে। কেউ পড়তে চেয়েছিল, কেউ বিয়ে করতে রাজি ছিল না, তবুও পরিবারের সিদ্ধান্তই ছিল শেষ কথা ।
বগুড়া মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের তথ্যে বলা হয়েছে। জেলায় চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে এ পর্যন্ত বাল্যবিয়ে বন্ধ করা গেছে ৪টি। ২০২৫ সালে ৩০টি আর ৩৭টি বিয়ে বন্ধ করা হয় ২০২৪ সালে। সঠিক তথ্যের মাধ্যমে সরাসরি পরিবারে গিয়ে ৩১টি বিয়ে বন্ধ করা গেছে ২০২৩ সালে।
এছাড়াও বেসরকারী উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) প্রোগ্রাম ফর ইকো-সোস্যাল ডেভলপমেন্ট (পেসড) এর তথ্যে এ বছর জেলার বিভিন্ন উপজেলায় বাল্যবিয়ে বন্ধ করা হয়েছে আরও ১৯টি।
বগুড়া মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক তাঞ্জিমা আখতার বলেন, ২০১৯ সালে করোনা মহামারী সময়ে বাল্যবিয়ের প্রবণতা বাড়ে সবচেয়ে বেশি। তবে এখন কিছুটা কমেছে। আর বেশিভাগ বিয়ে তথ্য গোপন করে বর-কণের বাড়িতে না হওয়ায় অজানা থেকে যায়। এছাড়াও অনেক বিয়ে বন্ধ করার পরও তারা গোপনে সম্পন্ন করেন। তিনি আরও বলেন, এ জেলার প্রায় ৬৫ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছরের নিচে আর ১৩ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বিয়ের প্রবণতা সবচেয়ে বেশি যা প্রায় ৭৫ শতাংশ। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, ওইসব কিশোরী নিজেরা সিদ্ধান্ত নিতে না পারায় পরিবার যা বলে সেটাই মেনে নেন।
গ্রামবাংলার অনেক পরিবার এখনও মনে করে, বয়স কম থাকতেই মেয়ের বিয়ে দিলে দায়িত্ব কমে যায়, ভবিষ্যৎ নিরাপদ হয়, ভালো পাত্র হাতছাড়া হয় না কিংবা যৌতুক কম লাগে।
কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। অপরিণত বয়সে মাতৃত্ব, অপুষ্টি, শারীরিক জটিলতা, মানসিক অবসাদ, শিক্ষাজীবনের সমাপ্তি এবং অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা- এসবই হয়ে ওঠে সেই সিদ্ধান্তের নির্মম পরিণতি।
ফুলি কিংবা অন্য কিশোরীদের গল্প তাই শুধু কয়েকটি পরিবারের ব্যক্তিগত ঘটনা নয়; এটি একটি সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে এখনও অনেক মেয়ের শৈশব হারিয়ে যায় নীরবে, প্রতিবাদহীনভাবে।
সেদিন সকালে ফুলি শুধু বলেছিল, “মা, আমি স্কুলে গেলাম।” সে জানত না, বইয়ের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে যে মেয়েটি স্কুলের পথে হাঁটছে, পরদিনই তার হাতে তুলে দেওয়া হবে সংসারের দায়, মাতৃত্বের ভার আর অকাল প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের বোঝা। আজও হয়তো গ্রামের কোনো পথ ধরে আরেকটি কিশোরী স্কুলে যাচ্ছে। হয়তো সেও জানে না- বাড়ি ফিরে তার জন্য অপেক্ষা করছে বই নয়, বিয়ের শাড়ি।