আদমদিঘী উপজেলাবগুড়া জেলা
প্রধান খবর

প্লাস্টিকের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প, সংকটে আদমদীঘির ৫০ পরিবার

রিপন দাস, বগুড়া: একসময় গ্রামবাংলার প্রতিটি ঘরে ঘরে ছিল বাঁশের ছোঁয়া। মাটির ঘরের খড়ের ছাউনি থেকে শুরু করে কুলা, চালুনি, ডালা, ডালি, তালপাখা, শিশুর দোলনা, ঝাড়ু কিংবা গরু-মহিষের গামাই-নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব সামগ্রীতেই ছিল বাঁশের ব্যবহার। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সেই ঐতিহ্য আজ হারিয়ে যেতে বসেছে। প্লাস্টিক ও আধুনিক পণ্যের দাপট, কাঁচামালের ঊর্ধ্বগতি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় বগুড়ার আদমদীঘির শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্প এখন অস্তিত্ব সংকটে।

একসময় যে পেশা ছিল অসংখ্য পরিবারের প্রধান জীবিকার উৎস, আজ তা টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় চলে গেছেন। তবে এখনও হাতে গোনা কয়েকজন কারিগর দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তার মধ্যেও ঐতিহ্য ধরে রাখার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন।

আদমদীঘি উপজেলার সান্দিড়া, ছাতিয়ানগ্রাম, নইকুল, জিনইর, তেতুলিয়া, বশিকোড়া, বন্তইর, বরিয়াবার্তাসহ প্রায় ১৫টি গ্রামের অন্তত ৫০টি পরিবার এখনও বাঁশ শিল্পের সঙ্গে জড়িত। পুরুষদের পাশাপাশি নারীরাও সংসারের কাজ শেষে বাঁশের বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি করেন। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় মিটিয়ে সংসার চালানোই এখন তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

কারিগররা জানান, একসময় গ্রামাঞ্চলে বাঁশের তৈরি পণ্যের ব্যাপক চাহিদা ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বিকল্প পণ্য বাজার দখল করায় দিন দিন কমছে ক্রেতা। অন্যদিকে কয়েক গুণ বেড়েছে কাঁচামালের দাম, ফলে উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।

তাদের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও একটি বাঁশ ৮০ থেকে ১০০ টাকায় কেনা যেত। বর্তমানে একই আকারের বাঁশ কিনতে গুনতে হচ্ছে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। কিন্তু সেই তুলনায় পণ্যের দাম বাড়েনি। ফলে অনেক সময় পণ্য বিক্রি করে লাভ তো দূরের কথা, লোকসানই গুনতে হচ্ছে। এছাড়া জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং নির্মাণকাজে বাঁশের ব্যবহার বাড়লেও পর্যাপ্ত বাঁশঝাড় না থাকায় কাঁচামালের সংকটও দিন দিন তীব্র হচ্ছে।

মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) বিকেলে আদমদীঘি উপজেলা সদরের হাটে কথা হয় বাঁশ শিল্পের কারিগর ও বিক্রেতা দুলাল বসাক, গোপাল চন্দ্র, আব্দুল মজিদ ও আব্দুল জলিলের সঙ্গে। তারা জানান, বহু বছর ধরে এই পেশার সঙ্গে জড়িত থাকলেও এখন সংসার চালাতে ধারদেনা করতে হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন সমিতি থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে কোনোমতে পেশাটি টিকিয়ে রেখেছেন।

কারিগরদের দাবি, সরকারি উদ্যোগে সহজ শর্তে স্বল্প সুদে ঋণ, কারিগরি প্রশিক্ষণ, আধুনিক নকশার পণ্য তৈরির সুযোগ এবং বাজারজাতকরণে সহযোগিতা পেলে বাঁশ শিল্প আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে। এতে শুধু একটি ঐতিহ্যবাহী শিল্পই রক্ষা পাবে না, বরং বহু পরিবার নতুন করে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ পাবে।

এ বিষয়ে আদমদীঘি উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা আকরাম হোসেন বলেন, “বেকারদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ এবং ক্ষুদ্র পরিসরে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া হয়। এতে অনেক বেকার ও কর্মহীন পরিবার স্বাবলম্বী হচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত বাঁশ শিল্পের কোনো কারিগর এ বিষয়ে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। কেউ যোগাযোগ করলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।”

পরিবেশবাদীদের মতে, পরিবেশবান্ধব ও টেকসই পণ্যের প্রতি বিশ্বজুড়ে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধুনিক বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমে আদমদীঘির ঐতিহ্যবাহী বাঁশ শিল্পকে নতুন করে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব। অন্যথায় গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই গুরুত্বপূর্ণ শিল্প একদিন ইতিহাসের পাতাতেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button