আদমদিঘী উপজেলাবগুড়া জেলা
প্রধান খবর

বগুড়ায় একই ধরনের প্রকল্পে দুই দফায় ১ কোটি টাকা বরাদ্দ, তদন্তে জেলা প্রশাসন

নিজস্ব প্রতিবেদক: মাত্র পাঁচ মাসের ব্যবধানে প্রায় একই ধরনের উন্নয়ন প্রকল্পে দুই দফায় মোট এক কোটি টাকা বরাদ্দ। অথচ সরেজমিনে মিলছে না সেই বরাদ্দের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দৃশ্যমান উন্নয়নকাজ। এমন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলা প্রশাসনের বিরুদ্ধে তদন্তে নেমেছে জেলা প্রশাসন।

বুধবার (২৯ জুলাই) জেলা প্রশাসকের নির্দেশে গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত দল উপজেলা পরিষদে গিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), উপজেলা প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এবং প্রকল্প-সংক্রান্ত নথিপত্র পর্যালোচনা করে।

তদন্ত দলে ছিলেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (উন্নয়ন ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা) জ্যেতি বিকাশ চন্দ্র, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর মনোনীত প্রতিনিধি শাকিউল ইসলাম এবং জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোতাহার হোসেন।

একই ধরনের প্রকল্পে দুই দফা বরাদ্দ

স্থানীয় সরকার বিভাগের জারি করা দুটি পৃথক প্রজ্ঞাপন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে উপজেলা প্রশাসনিক ভবন, আবাসিক ভবন এবং রাস্তা সংস্কারের জন্য প্রায় একই ধরনের প্রকল্পে দুই দফায় ৫০ লাখ টাকা করে মোট ১ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।

প্রথম প্রজ্ঞাপনটি জারি হয় ২০২৫ সালের ১১ ডিসেম্বর। স্থানীয় সরকার বিভাগের যুগ্মসচিব আবু রাফা মোহাম্মদ আরিফ স্বাক্ষরিত ওই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে “উপজেলা উন্নয়ন সহায়তা” খাত থেকে আদমদীঘি উপজেলার ছয়টি প্রকল্পে ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। এতে উপজেলা কৃষি অফিস পর্যন্ত আরসিসি রাস্তা নির্মাণ, ইউএনওর বাসভবনের রাস্তা, উপজেলা পরিষদের নতুন ও পুরাতন প্রশাসনিক ভবনের সংস্কার এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনের মেরামতের কাজ অন্তর্ভুক্ত ছিল।

পরবর্তীতে ২০২৬ সালের ১০ মে স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব সুলতানা আক্তার স্বাক্ষরিত আরেকটি প্রজ্ঞাপনে সংশোধিত এডিপির আওতায় আবারও উপজেলা পুরাতন প্রশাসনিক ভবন, নতুন প্রশাসনিক ভবনসংলগ্ন রাস্তা, ইউএনওর বাসভবনের প্রবেশ সড়ক, উপজেলা কৃষি অফিসের সামনের রাস্তা এবং যমুনা ও রূপসা আবাসিক ভবনের মেরামতের জন্য আরও ৫০ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়।

দুটি প্রজ্ঞাপনের প্রকল্প তালিকা পর্যালোচনায় দেখা যায়, অধিকাংশ প্রকল্প একই অবকাঠামোকে কেন্দ্র করেই পুনরায় বরাদ্দ পেয়েছে। ফলে অল্প সময়ের ব্যবধানে একই ধরনের কাজের জন্য পুনরায় অর্থ বরাদ্দের প্রয়োজনীয়তা ও প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সরেজমিনে যা দেখা গেল

উপজেলা পরিষদ এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নতুন প্রশাসনিক ভবনের সাজসজ্জাসহ বেশ কয়েকটি অবকাঠামোগত উন্নয়ন আগের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোমানা আফরোজের দায়িত্বকালেই সম্পন্ন হয়েছে।

অন্যদিকে, দুই দফা বরাদ্দ তালিকায় থাকা উপজেলা কৃষি অফিসের সামনের সড়কে দৃশ্যমান কোনো সংস্কার কাজের আলামত পাওয়া যায়নি।

একইভাবে রূপসা আবাসিক ভবনেও তেমন কোনো সংস্কারের চিহ্ন দেখা যায়নি। ভবনের দেয়ালে শেওলা জমে রয়েছে এবং দীর্ঘদিন রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট।

যমুনা আবাসিক ভবনের নিচতলার বারান্দায় গাছপালা জন্মেছে। দেয়াল ও ছাদে শেওলা এবং পরজীবী উদ্ভিদের উপস্থিতি লক্ষ্য করা গেছে। কাঠের জানালার একাধিক পাল্লাও নষ্ট হয়ে রয়েছে। চারটি ফ্ল্যাটের মধ্যে বর্তমানে মাত্র একটি ফ্ল্যাটে একটি পরিবার বসবাস করছে।

এছাড়া উপজেলা পরিষদের দক্ষিণ ও পূর্ব পাশের সীমানা প্রাচীর পুনর্নির্মাণের কাজ চলমান থাকলেও সংশ্লিষ্ট দুটি প্রজ্ঞাপনের কোনো প্রকল্প তালিকায় ওই কাজের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

যা বলছেন কর্মকর্তারা

অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুমা বেগম বলেন, “দ্বিতীয়বার নতুন প্রকল্পের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মন্ত্রণালয় ভুলক্রমে আগের প্রকল্পগুলোর নামেই পুনরায় বরাদ্দ দিয়েছে। পরে উপজেলা মাসিক সমন্বয় সভায় দুটি বরাদ্দ সমন্বয় করে নতুন কাজের তালিকা ও রেজুলেশন অনুমোদন করা হয়েছে। বর্তমানে সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।”

তবে উপজেলা প্রকৌশলী রিপন কুমার সাহা বলেন, “কাজে কোনো দুর্নীতি হয়নি। তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া প্রকল্প পরিবর্তন করে কাজ করা সঠিক হয়নি।”

প্রকল্প পরিবর্তনের ক্ষেত্রে মন্ত্রণালয়ের পূর্বানুমোদন ছাড়া উপজেলা পর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ কতটা বিধিসম্মত-সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের গঠিত তদন্ত দলের সদস্যরা সাংবাদিকদের জানান, তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করা হবে না।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button