বগুড়ায় পরিবারের সিদ্ধান্তে হারিয়ে যাচ্ছে কিশোরীদের স্বপ্ন
দারিদ্র্য, সামাজিক চাপ আর সচেতনতার অভাবে বাড়ছে বাল্যবিয়ে

রিপন দাস, বগুড়া: এখনতো সপ্তম শ্রেণিতে পইরত্যাছি। পড়ালেখা আমার ভালো লাগে, কিন্তু আব্বাতো অনেক গরিব মানুষ সায়েন্সে পড়তে পারবো কীনা তা এখনও ঠিক করিনাই। আরও দুই ক্লাসতো আগে পড়ি, তারপর দেখমোনে। যাই হোক এসএসসি পাস করে আমি কলেজে পড়মো, এটা আমার স্বপ্ন। মেয়েদের পড়ালেখার অনেক সুযোগ আছে আর আমি এ সুযোগ নিয়া বড় হব্যার চাই। স্কুলে মাঝে মধ্যে অনেক বড় আপারা আসে তারা এ স্কুল থেকে পাস করে বড় বড় অফিসার হইছে। আর বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেখছি মেয়েরা অনেক কিছু করে। আমি কিছু একটা হতে পারমো আশা করি। কিন্তু আব্বাতো অনেকদিন হইলো বিয়ের জন্য ছেলে দেখা-দেখি করে। কিন্তু আমাকে কিছু কই না। পাঁচ-ছয় মাস হলো আমি সপ্তম শ্রেনিতে পইরত্যাছি এ সময় বিয়া হইলে আমি কী ঠিকমতো পড়ালেখা পারমো? এ কথাগুলো বলছিলেন, কিশোরী জনৈকা লীনা। তার বাবার কথার বিরুদ্ধে কোন প্রতিবাদ করতে না পেরে অকালে বিয়ের পিঁড়িতে বসতে হয় তাকে।
বগুড়ার ধুনট উপজেলার একটি গ্রামে গত ৩ জুলাই সপ্তম শ্রেণির এক ছাত্রীর বিয়ে হয়। স্বজনরা জানান, প্রায় এক বছর ধরেই মেয়ের জন্য পাত্র খোঁজা হচ্ছিল। একই উপজেলার চিকাশী ইউনিয়নে বাড়ির ওই যুবক সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজে অনার্স প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী। যুবকের পরিবারের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আসে। আর যৌতুকের দাবি না থাকায় মেয়ের পরিবার দ্রুত রাজি হয়ে যায়। দিনমজুর বাবা নিকটাত্মীয় ও প্রতিবেশিদের কাছ থেকে সহযোগিতা নিয়ে বেশ ধুমধাম করে সম্পন্ন করেন মেয়ের বিয়ে।
কিন্তু পরিবার থেকে জানানো হয় বিয়ে হয়েছে সমস্যা কী? মেয়ে যদি পড়তে চায় তাহলে লেখাপড়া করতে পারবে।
ধুনট উপজেলার আরেকটি হিন্দু পরিবারে কয়েক মাস আগে ১২ বছর বয়সী এক কিশোরীর বিয়ে দেওয়া হয় বেশ সাজসজ্জা করে।
অদ্ভুত বিষয় হলো- পরিবারের বড় মেয়ের বিয়ে হয়নি। তিনি নার্সিং শেষ করে একটি বেসরকারি ক্লিনিকে চাকরি করছেন। সেই কারণেই ছোট মেয়েকে আগে বিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন বাবা-মা। পঞ্চম শ্রেণি পাস করার পর থেকেই শুরু হয় বিয়ের প্রস্তুতি।
মেয়েটি রাজি ছিল না। তার মতামত উপেক্ষা করেই কুষ্টিয়ার ভেড়ামারা উপজেলার এক যুবকের সঙ্গে বিয়ে দেওয়া হয়। পরিবারের বিশ্বাস ছিল, মেয়েটি সুখে থাকবে। কিন্তু বিয়ের কিছুদিনের মধ্যেই তার বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা দেখা দেয়। বর্তমানে মেয়ের স্বাস্থ্য নিয়ে গভীর উদ্বেগে রয়েছেন বাবা-মা।
ধুনট পৌর এলাকার একটি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক জানান, যেসব ছাত্রীর বিয়ে হচ্ছে, তারা সরকারের শিক্ষাবৃত্তি ও আর্থিক সহায়তার সুযোগ হারাচ্ছে। অনেক পরিবার বিষয়টি গোপন রাখার চেষ্টা করলেও বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তথ্য যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছে। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ে নিয়মিত বাল্যবিয়ে প্রতিরোধে সচেতনতামূলক আলোচনা করা হলেও সামাজিক বাস্তবতায় তা সব সময় কার্যকর হচ্ছে না।
গাইনি ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ ডা. মনোজ্ঞ চিত্রলেখা কুন্ডু বলেন, “১৮ বছরের আগে বিয়ে ও গর্ভধারণ মা ও নবজাতক উভয়ের জন্যই বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করে। এ বয়সে অধিকাংশ কিশোরীর শরীর ও প্রজনন অঙ্গ পুরোপুরি পরিণত হয় না। ফলে রক্তশূন্যতা, অপুষ্টি, গর্ভকালীন উচ্চ রক্তচাপ, দীর্ঘ ও জটিল প্রসব, অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, সংক্রমণ এবং কম ওজনের শিশুর জন্মের ঝুঁকি বেড়ে যায়। অনেক ক্ষেত্রে জরুরি অস্ত্রোপচারও প্রয়োজন হয়।”
তিনি আরও বলেন, অল্প বয়সে মাতৃত্ব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলে। অনেক কিশোরী শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে, পারিবারিক দায়িত্বের চাপে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, আত্মবিশ্বাসের অভাব ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতায় ভোগে। একই সঙ্গে প্রসবকালীন জটিলতায় মাতৃমৃত্যু এবং নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকিও তুলনামূলক বেশি থাকে।
বগুড়ার ধুনট উপজেলার গোসাইবাড়ী এলাকার মোঃ আতিকুল ইসলাম জানান, গত ঈদুল আজহার ছুটিতে চৌকিবাড়ী ইউনিয়নের চৌকিবাড়ী গ্রামে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীর বিয়ে পরিবারের পছন্দে দেওয়া হয়।
এ ছাড়া কালেরপাড়া ও চিকাশী ইউনিয়নেও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া একাধিক কিশোরীর বিয়ে দেয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। গোপালনগর ইউনিয়নের কয়েকটি গ্রামে প্রাথমিক পাশ করা কিশোরীদের বিয়ে দিয়েছে পরিবার। স্থানীয়দের দাবি, এসব ঘটনার বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই কিশোরীদের মতামতকে গুরুত্ব না দিয়ে তাদের অনিচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পন্ন করা হয় বিয়ে।