আদমদিঘী উপজেলাবগুড়া জেলা
প্রধান খবর

সংরক্ষণের অভাবে বিলীন হওয়ার পথে রানী ভবানীর জন্মভূমি

বগুড়া প্রতিনিধি: ইতিহাসের মহিয়সী নারী রানী ভবানীর জন্মভূমি বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার ছাতিয়ান গ্রামের ঐতিহাসিক জমিদারবাড়ি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ না থাকায় প্রাচীন স্থাপনাটি হারাচ্ছে তার ঐতিহ্য ও অস্তিত্ব। স্থানীয়দের অভিযোগ, একদিকে অবহেলা ও অপরদিকে অবৈধ দখলের কারণে রানী ভবানীর জন্মভূমির স্মৃতিচিহ্ন ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

স্থানীয় প্রবীণরা জানান, ছাতিয়ান গ্রামের প্রাচীন নাম ছিল ‘মহনগঞ্জ’। একসময় এ এলাকায় ছিল ঘন বন-জঙ্গল। বনজুড়ে বিচরণ করত নানা ধরনের বন্যপ্রাণী। সেই সময় ছাতিয়ান গ্রামে জমিদার ছিলেন আত্মারাম চৌধুরী। তাঁর স্ত্রী ছিলেন তমাদেবী চৌধুরী। তাঁদেরই কন্যা ছিলেন পরবর্তী সময়ে ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে ওঠা রানী ভবানী।

স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ইতিহাস অনুযায়ী, ছোটবেলা থেকেই ভবানী ছিলেন মানবসেবায় নিবেদিত। এলাকার দরিদ্র মানুষের কষ্ট লাঘব, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং পানির সংকট দূর করতে তিনি নানা জনকল্যাণমূলক উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগে এলাকায় মসজিদ-মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের পাশাপাশি অসংখ্য পুকুর খননের কথাও স্থানীয়ভাবে প্রচলিত রয়েছে। কথিত আছে, এলাকার পানির সংকট মোকাবিলায় তিনি ৩৬৫টি পুকুর খনন করেছিলেন এবং প্রতিদিন একটি করে পুকুরে গোসল করতেন।

রানী ভবানীর বিয়েকে ঘিরেও ছাতিয়ান গ্রামে রয়েছে নানা লোককথা ও ঐতিহাসিক স্মৃতি। স্থানীয় প্রবীণদের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় নাটোরের জমিদার পরিবারের সদস্যরা ছাতিয়ান গ্রামের জঙ্গলে শিকারে আসতেন। এমনই একদিন ভোরে শিকারে বের হয়ে রামাকান্ত নামের এক জমিদার গাছের নিচে ফুল তুলতে থাকা এক কিশোরীকে দেখতে পান। পরে খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন, মেয়েটি ছাতিয়ান গ্রামের জমিদার আত্মারাম চৌধুরীর একমাত্র কন্যা ভবানী।

কথিত আছে, ভবানীর সৌন্দর্য ও ব্যক্তিত্বে মুগ্ধ হয়ে রামাকান্ত বিষয়টি তাঁর পরিবারের কাছে জানান। পরে বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে ছাতিয়ান গ্রামে আসেন নাটোরের জমিদার পরিবারের সদস্যরা। বিয়েতে ভবানীর কয়েকটি শর্ত ছিল বলেও স্থানীয়দের কাছে প্রচলিত রয়েছে।

শর্তগুলোর মধ্যে ছিল- বিয়ের পর এক বছর তিনি পিতার বাড়িতে অবস্থান করবেন; ছাতিয়ান গ্রামের জমিদারবাড়ি থেকে নাটোরের জমিদারবাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ করে তা লাল শালু কাপড়ে আবৃত করতে হবে এবং সেই পথ দিয়েই তিনি স্বামীর বাড়িতে যাবেন। পাশাপাশি এলাকার দরিদ্র প্রজাদের ভূমি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করার শর্তও তিনি দিয়েছিলেন বলে স্থানীয়দের দাবি। জমিদার পরিবার তাঁর এসব শর্ত মেনে নেয় বলে প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ রয়েছে।

পরবর্তী সময়ে রানী ভবানী বৃহৎ জমিদারি পরিচালনা এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের জন্য বাংলার ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ স্থান করে নেন। তাঁর দান, শিক্ষা বিস্তার, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের নানা স্মৃতি এখনো বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে রয়েছে।

ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা সেই রানী ভবানীর জন্মভূমি ছাতিয়ান গ্রামের জমিদার বাড়ির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় স্থাপনাটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, যথাযথ সংরক্ষণ না থাকায় ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ধীরে ধীরে দখল ও অবহেলার শিকার হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত স্থাপনাটি জরিপ করে প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পুরো এলাকা সংরক্ষণের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

ছাতিয়ান ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মহি উদ্দীন তালুকদার বলেন, “সরকারি উদ্যোগে জমিদারবাড়িটি সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে একদিকে এটি দখলদারদের কবল থেকে রক্ষা পাবে, অন্যদিকে রানী ভবানীর জন্মভূমির ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্নও যুগ যুগ ধরে টিকে থাকবে।”

স্থানীয়দের মতে, শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা হিসেবে নয়, বাংলার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে রানী ভবানীর জন্মভূমিকে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে স্থানটি একদিকে যেমন ইতিহাস ও গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে, অন্যদিকে পর্যটন সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

তাই ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন রক্ষায় দ্রুত সরকারি উদ্যোগ, প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ, অবৈধ দখলমুক্তকরণ এবং পরিকল্পিত সংস্কার ও সংরক্ষণের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button