
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তি সই করেছে বাংলাদেশ। এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশি পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক (রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ) কমে ১৯ শতাংশে নেমে এসেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানিকৃত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি বাংলাদেশি পোশাক পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া হবে, যা দেশের তৈরি পোশাক খাতে নতুন গতি সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাণিজ্যসচিব মাহবুবুর রহমান সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) এ তথ্য নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশ সময় রাত ১০টার দিকে ওয়াশিংটনে নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন এবং যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (ইউএসটিআর) জেমিসন গ্রিয়ার।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান, প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী এবং বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন। গত বছরের এপ্রিল থেকে প্রায় নয় মাস ধরে এই চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা চলছিল।
চুক্তি সইয়ের পর মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধি জেমিসন গ্রিয়ার আলোচনায় সার্বিক নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের প্রশংসা করেন। একই সঙ্গে তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধি দলকে তাদের ‘অসাধারণ প্রচেষ্টা’র জন্য ধন্যবাদ জানান। তার মতে, এই চুক্তি যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য নীতির সঙ্গে বাংলাদেশের অবস্থানকে আরও সামঞ্জস্যপূর্ণ করবে।
বাণিজ্য উপদেষ্টা শেখ বশিরউদ্দীন বলেন, এই চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক এক নতুন ঐতিহাসিক পর্যায়ে পৌঁছেছে। এর ফলে উভয় দেশ একে অপরের বাজারে আগের তুলনায় আরও বেশি প্রবেশাধিকার পাবে।
এর আগে বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্কহার ছিল ৩৭ শতাংশ, যা গত বছরের আগস্টে কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়। নতুন চুক্তির মাধ্যমে তা আরও এক শতাংশ কমিয়ে ১৯ শতাংশে নামানো হলো।
জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা খলিলুর রহমান বলেন, ২০ শতাংশ থেকে শুল্কহার ১৯ শতাংশে নামিয়ে আনা বাংলাদেশের রপ্তানিকারকদের জন্য বাড়তি সুবিধা বয়ে আনবে। পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু বস্ত্র ও পোশাকপণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেশের তৈরি পোশাক খাতে উল্লেখযোগ্য গতি সঞ্চার করবে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি বাংলাদেশের পক্ষে এই চুক্তির প্রধান আলোচক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
চুক্তিটি সোমবার উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে অনুমোদন পেয়েছে। দুই দেশ প্রয়োজনীয় প্রজ্ঞাপন জারি করলে এটি কার্যকর হবে।
সংশোধিত শুল্কহারের ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রধান পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ তুলনামূলকভাবে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে রয়েছে। ভিয়েতনামের ওপর যেখানে ২০ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয়েছে, সেখানে ভারত ১৮ শতাংশ শুল্ক নিশ্চিত করেছে। পাকিস্তান, কম্বোডিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার পণ্যের ওপরও ১৯ শতাংশ হারে শুল্ক আরোপ করা হয়েছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে পোশাক রপ্তানির ক্ষেত্রে চীন শীর্ষ অবস্থানে রয়েছে। এরপর ভিয়েতনাম, তৃতীয় স্থানে বাংলাদেশ এবং চতুর্থ স্থানে ভারত।
বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান জানান, যুক্তরাষ্ট্র এই অঞ্চলের কোনো দেশকেই ১৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক সুবিধা দেয়নি। তার মতে, সম্প্রতি সই হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ভারত বাণিজ্য চুক্তি বাংলাদেশের ফলাফলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে, যার পেছনে ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণও কাজ করেছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ডব্লিউটিও সেলের সাবেক মহাপরিচালক মো. হাফিজুর রহমান বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি থাকার কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ভারত বাড়তি নমনীয়তা পেয়েছে। তবে স্বল্প শ্রমব্যয় ও কম উৎপাদন খরচের কারণে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগের তেমন কোনো কারণ নেই বলে তিনি মনে করেন।
চুক্তির অংশ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা, গম, সয়াবিন ও এলএনজি আমদানির বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ই-কমার্সে শুল্ক না আরোপ, মেধাস্বত্ব সংক্রান্ত মার্কিন মানদণ্ড অনুসরণ এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সংস্কারে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবকে সমর্থনের বিষয়ও এতে রয়েছে।
এ ছাড়া বাণিজ্যিক টানাপোড়েন কমানোর বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে মার্কিন উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িং থেকে ২৫টি বিমান কেনার বিষয়ে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ, যার আনুমানিক ব্যয় ৩০ থেকে ৩৫ হাজার কোটি টাকা।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যমতে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও বাংলাদেশের বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। গত অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ৮.৬৯ বিলিয়ন ডলার, যার বড় অংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে।
তথ্যসূত্র: বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড



