
কলম্বিয়ায় আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৩২ জনে। আহত হয়েছেন আরও ৫৭০ জন। স্থানীয় সময় সোমবার (১০ আগস্ট) আঘাত হানা এই ভূমিকম্পের পর দেশটিতে দফায় দফায় আফটারশকের খবর পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পে দেশটির পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধসে পড়েছে বহু ভবন, বন্ধ রয়েছে কয়েকটি বিমানবন্দর। এখনও অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধারকাজে ভারী যন্ত্রপাতির সংকটও দেখা দিয়েছে।
সংবাদমাধ্যম সিএনএনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কলম্বিয়ায় আঘাত হানা শতাব্দীর সবচেয়ে শক্তিশালী এই ভূমিকম্পে হতাহতের তথ্য জানিয়েছে কলম্বিয়ান অ্যাসোসিয়েশন অব ক্যাপিটাল সিটিজ। ভূমিকম্পের পর প্রেসিডেন্টের সঙ্গে দুর্যোগ মোকাবিলা বিষয়ক বৈঠকেও অংশ নেয় সংগঠনটি। তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শুধু পেরেইরা শহরেই ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে।
দেশটির পাঁচটি রাজধানী শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা বা রেড অ্যালার্ট জারি করা হয়েছে। ধসে পড়েছে ৮৬টি ভবন এবং সাতটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ভূমিকম্পে কলম্বিয়ার পশ্চিমাঞ্চলের ক্যালি, পেরেইরা, কুইবদো ও মানিজালেস শহরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রতিবেশী ইকুয়েডর ও পানামাতেও কম্পন অনুভূত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল চোকো অঞ্চলের সান হোসে দেল পালমার এলাকায়। রাজধানী বোগোতা থেকে এলাকাটি প্রায় ৪০০ কিলোমিটার পশ্চিমে। ভূমিকম্পটির উৎপত্তি হয় ভূপৃষ্ঠের ১০৭ কিলোমিটার গভীরে।
ভূমিকম্পের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে অন্তত ২১টি আফটারশক অনুভূত হয়েছে। দেশটির তৃতীয় বৃহত্তম শহর ক্যালিতে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও তল্লাশি চালাচ্ছেন। স্বেচ্ছাসেবকেরা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে কংক্রিটের বড় টুকরো ও অন্যান্য ধ্বংসাবশেষ সরিয়ে নিচ্ছেন।
স্থানীয় কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ক্যালিতে অন্তত ২০টি ভবন ধসে পড়েছে এবং ৩৮০টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে অনেক মানুষ আটকা পড়ে আছেন।
ক্যালির ৬৪ বছর বয়সী ট্যাক্সিচালক হোর্হে মোনকায়ো অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, ভবনগুলো ধসে পড়ার সময় পুরো শহরজুড়ে ধুলার মেঘ উঠতে দেখেছেন তিনি। তার ভাষায়, পুরো বাড়ি কেঁপে উঠেছিল এবং এত শক্তিশালী ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা তার আগে কখনো হয়নি।
ক্যালিতে ধসে পড়া একটি ভবনের ধ্বংসাবশেষ সরানোর কাজে অংশ নেওয়া হুয়ান কার্লোস অসোরিও কারাকোল টেলিভিশনকে বলেন, একটি ভবন ধসে পড়ার শব্দ তার কাছে বোমা বিস্ফোরণের মতো মনে হয়েছিল। তিনি জানান, প্রতিবেশীরা একসঙ্গে মানবশৃঙ্খল তৈরি করে ধ্বংসাবশেষ সরাচ্ছেন। তবে উদ্ধারকাজে আরও ভারী যন্ত্রপাতি প্রয়োজন।
নতুন প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েলা শপথ নেওয়ার মাত্র কয়েক দিন পর এই ভূমিকম্প আঘাত হানায় তার সরকারের সামনে এটিই প্রথম বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
স্থানীয় সময় দুপুর ১টার দিকে জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে জাতীয় জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন দে লা এসপ্রিয়েলা। তিনি জানান, মানুষের জীবন রক্ষা, ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীকে সহায়তা এবং প্রয়োজনীয় এলাকায় ত্রাণ পৌঁছে দিতে জাতীয় সরকার তার সব সক্ষমতা কাজে লাগিয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করাই সরকারের প্রথম অগ্রাধিকার।
প্রাথমিক হিসাবে প্রেসিডেন্ট জানিয়েছিলেন, ভূমিকম্পে ১১১ জন নিহত ও ৮৭ জন আহত হয়েছেন। পরে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে ১৩২ জনে পৌঁছায়। আহতের সংখ্যাও বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৭০ জনে।
স্থানীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কফি উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে পরিচিত রিসারালদা এলাকাতেই অন্তত ৪০ জন নিহত হয়েছেন। ওই অঞ্চলের রাজধানী পেরেইরায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ধসে পড়া ভবনগুলোতে এখনও জীবিতদের খোঁজে অভিযান চালাচ্ছেন উদ্ধারকর্মীরা।
ভায়া দেল কাউকা অঞ্চলে অন্তত ২৭ জন নিহত হয়েছেন। এই অঞ্চলেই ক্যালি শহর অবস্থিত। নিহতদের মধ্যে তিন শিশুও রয়েছে।
কলম্বিয়ার বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ করে দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে পেরেইরা, মানিজালেস, কুইবদো, আরমেনিয়া, কার্তাগো ও বুয়েনাভেনতুরা। এসব বিমানবন্দরের অবকাঠামো নিরাপদ কি না, তা পরীক্ষা করছেন প্রকৌশলীরা।
প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের ভূমিকম্পপ্রবণ রিং অব ফায়ারের ওপর অবস্থিত হওয়ায় কলম্বিয়ায় ছোট মাত্রার ভূমিকম্প প্রায়ই হয়। স্থানীয়ভাবে এসব ভূমিকম্পকে ‘তেমব্লোরেস’ বলা হয়। তবে ৬ মাত্রার বেশি শক্তিশালী ভূমিকম্প সেখানে তুলনামূলক বিরল।
১৯৯৯ সালে আরমেনিয়া শহরের কাছে ৬ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পে ১ হাজার ১০০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
কলম্বিয়ার ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, সোমবারের ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি একবিংশ শতাব্দীতে দেশটিতে রেকর্ড হওয়া সবচেয়ে শক্তিশালী ভূমিকম্প।
তথ্যসূত্র: চ্যানেল ২৪

