আন্তর্জাতিক খবর
প্রধান খবর

হিরোশিমা দিবস আজ: ৮১ বছর পরও পারমাণবিক যুদ্ধের আতঙ্কে বিশ্ব

প্রতি বছর ৬ আগস্ট গভীর শোক, অনুশোচনা ও আত্মসমালোচনার মধ্য দিয়ে পালিত হয় হিরোশিমা দিবস। ১৯৪৫ সালের এই দিনে জাপানের হিরোশিমা শহরের ওপর মানব ইতিহাসে প্রথমবারের মতো যুদ্ধক্ষেত্রে পারমাণবিক বোমা ব্যবহার করা হয়। মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে একটি প্রাণবন্ত শহর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। তিন দিন পর নাগাসাকিতে দ্বিতীয় পারমাণবিক বোমা হামলার মধ্য দিয়ে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করে প্রযুক্তির সবচেয়ে ভয়াবহ ও অমানবিক ব্যবহার।

হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলায় আনুমানিক ২ লাখ ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়। এর মধ্যে হিরোশিমায় প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার এবং নাগাসাকিতে প্রায় ৮০ হাজার মানুষ নিহত হন। অসংখ্য মানুষ আজীবন বিকলাঙ্গতা, ক্যানসার ও জেনেটিক জটিলতায় ভুগেছেন। সেই ক্ষত আজও মানবতার বিবেককে নাড়া দেয়।

ছবি: সংগৃহীত

হিরোশিমা দিবস কেবল অতীত স্মরণের দিন নয়; এটি ভবিষ্যৎ রক্ষার শপথ গ্রহণের দিনও। এমন এক পৃথিবী গড়ার অঙ্গীকারের দিন, যেখানে কোনো রাষ্ট্র, সরকার বা গোষ্ঠী আর কখনো মানবজাতির বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবে না।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৬ সালের বিশ্বে পারমাণবিক অস্ত্রের আধুনিকীকরণ, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অস্ত্র প্রতিযোগিতা বাড়তে থাকায় হিরোশিমার শিক্ষা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।

যেভাবে ঘটেছিল ইতিহাসের ভয়াবহতম হামলা

১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট সকাল ৮টা ১৫ মিনিটে যুক্তরাষ্ট্রের বি-২৯ বোমারু বিমান Enola Gay থেকে ‘Little Boy’ নামের ইউরেনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক বোমা হিরোশিমার ওপর নিক্ষেপ করা হয়। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে সৃষ্টি হয় কয়েক হাজার ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা, ভয়াবহ বিস্ফোরণ এবং প্রাণঘাতী তেজস্ক্রিয় বিকিরণ।

তিন দিন পর ৯ আগস্ট Bockscar নামের আরেকটি বি-২৯ বিমান থেকে নাগাসাকিতে ‘Fat Man’ নামের প্লুটোনিয়ামভিত্তিক পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়।

হিরোশিমা ও নাগাসাকির জীবিত বেঁচে যাওয়া মানুষদের জাপানে ‘হিবাকুশা’ (Hibakusha) নামে পরিচিত। তাদের জীবনসংগ্রাম বিশ্বকে বারবার মনে করিয়ে দেয়-পারমাণবিক যুদ্ধে কোনো বিজয়ী নেই; সবাই পরাজিত।

বিশ্বের হাতে এখনো হাজার হাজার পারমাণবিক অস্ত্র

বর্তমানে বিশ্বের অন্তত নয়টি রাষ্ট্রের হাতে পারমাণবিক অস্ত্র রয়েছে। দেশগুলো হলো-যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন, ভারত, পাকিস্তান, উত্তর কোরিয়া এবং ইসরাইল (যদিও ইসরাইল আনুষ্ঠানিকভাবে এটি স্বীকার করে না)।

আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রায় ১২ হাজারের বেশি পারমাণবিক ওয়ারহেড রয়েছে। এর মধ্যে হাজার হাজার অস্ত্র তাৎক্ষণিক ব্যবহারের জন্য প্রস্তুত অবস্থায় রাখা হয়েছে।

একই সঙ্গে বড় শক্তিগুলো নতুন প্রজন্মের ক্ষেপণাস্ত্র, সাবমেরিন, হাইপারসনিক অস্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সামরিক প্রযুক্তি উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করছে।

নতুন অস্ত্র প্রতিযোগিতা নিয়ে উদ্বেগ

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী স্নায়ুযুদ্ধের সময় পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা বিশ্বকে ‘Mutual Assured Destruction (MAD)’ বা পারস্পরিক নিশ্চিত ধ্বংসের তত্ত্বের মুখোমুখি করেছিল।

বর্তমানে পরিস্থিতি আরও জটিল। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, যুক্তরাষ্ট্র-চীন প্রতিদ্বন্দ্বিতা, উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি, ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা এবং ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক দক্ষিণ এশিয়াসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে নতুন করে পারমাণবিক ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং কোয়ান্টাম কম্পিউটিংয়ের ব্যবহার পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবস্থাকে আরও জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। মানুষের পরিবর্তে অ্যালগরিদমনির্ভর সিদ্ধান্ত গ্রহণ ভবিষ্যতে নতুন নৈতিক ও নিরাপত্তা সংকট সৃষ্টি করতে পারে।

বিখ্যাত বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন একসময় বলেছিলেন,

“আমি জানি না তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধে কী অস্ত্র ব্যবহার হবে, তবে চতুর্থ বিশ্বযুদ্ধে মানুষ লাঠি ও পাথর নিয়ে লড়াই করবে।”

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অস্ত্র প্রতিযোগিতা আইনস্টাইনের সেই আশঙ্কাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি মাঝারি শক্তির পারমাণবিক বোমা কোনো বড় শহরে বিস্ফোরিত হলে কয়েক লাখ মানুষ মুহূর্তেই নিহত হতে পারেন। ধ্বংস হয়ে যেতে পারে হাসপাতাল, বিদ্যুৎ, পানি ও যোগাযোগব্যবস্থা। তেজস্ক্রিয় বিকিরণের কারণে দীর্ঘমেয়াদে ক্যানসার, হৃদরোগ, জন্মগত ত্রুটি এবং পরিবেশগত বিপর্যয় দেখা দিতে পারে।

বিজ্ঞানীরা আরও সতর্ক করেছেন, বড় ধরনের পারমাণবিক যুদ্ধ হলে বায়ুমণ্ডলে ধোঁয়া ও ধূলিকণা ছড়িয়ে সূর্যালোক বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এর ফলে সৃষ্টি হতে পারে ‘পারমাণবিক শীত’ (Nuclear Winter), যা বিশ্বব্যাপী খাদ্যসংকট ও দুর্ভিক্ষ ডেকে আনতে পারে।

বাংলাদেশের অবস্থান

বাংলাদেশ শান্তিপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী একটি দেশ। ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’-এই নীতির ভিত্তিতে বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে নিরস্ত্রীকরণ ও বৈশ্বিক শান্তির পক্ষে ধারাবাহিকভাবে অবস্থান নিয়ে আসছে। জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমেও বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।

হিরোশিমা দিবসের মূল বার্তা একটিই-পারমাণবিক অস্ত্র নিরাপত্তার প্রতীক নয়; এটি মানবজাতির অস্তিত্বের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি। অতীতের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে শান্তি, নিরস্ত্রীকরণ এবং মানবকল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রতি বছর বিশ্বজুড়ে দিবসটি পালন করা হয়।

লেখক : ফিকামলি তত্ত্বের জনক; বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক, গবেষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button