
একটি ম্যাচের ফল কখনো কখনো শুধু একটি দলের জয়-পরাজয়ের হিসাব থাকে না; বদলে দিতে পারে অন্য কয়েকটি দলের ভাগ্যও। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে আফগানিস্তানের তৃতীয় ওয়ানডের ফল যেন তারই উদাহরণ। বেলফাস্টে ৩ উইকেটের জয় নিয়ে আফগানিস্তান শুধু সিরিজ নিশ্চিত করেনি, তাদের এই জয়ে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার সমীকরণও পরিষ্কার হয়ে গেছে।
সবচেয়ে বড় সুবিধা পেয়েছে বাংলাদেশ। আফগানিস্তানের জয়ে নির্ধারিত সময়ের আগেই সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার জায়গা নিশ্চিত হয়েছে বাংলাদেশের। বিপরীতে একই ফল বড় ধাক্কা দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে। দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের এখন সরাসরি বিশ্বকাপে যাওয়ার আর কোনো সুযোগ নেই। আগামী বছরের বিশ্বকাপে জায়গা করে নিতে হলে আবারও তাদের নামতে হবে বাছাইপর্বের কঠিন পরীক্ষায়।
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তৃতীয় ওয়ানডেতে আগে ব্যাট করে ২০৬ রানে অলআউট হয় আয়ারল্যান্ড। রান তাড়ায় ৩৬ ওভার শেষে ১৭৬ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে চাপে পড়ে আফগানিস্তান। কিন্তু অধিনায়ক রশিদ খান এক প্রান্ত আগলে রেখে দলকে জয় এনে দেন। ৩৭ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। এর আগে বল হাতে ৪৪ রান দিয়ে নিয়েছিলেন ৩ উইকেট। শেষ পর্যন্ত ৩ উইকেটের জয় পায় আফগানিস্তান।
এই জয়ের ফলে পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যায় আফগানরা। একই সঙ্গে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে নিজেদের জায়গাও নিশ্চিত করে তারা। তবে আফগানিস্তানের এই জয় বাংলাদেশের জন্যও হয়ে ওঠে বড় সুখবর।
২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার জন্য র্যাঙ্কিংয়ের হিসাবই ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত কাট-অফ সময়ের মধ্যে স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়ে বাদে শীর্ষ আট দল সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পাবে।
তবে এখানে রয়েছে একটি গুরুত্বপূর্ণ সমীকরণ। সহ-আয়োজক দক্ষিণ আফ্রিকা যদি র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ আটের মধ্যে থাকে, তাহলে তাদের জায়গাটি বাদ দিয়ে পরের দলও সরাসরি বিশ্বকাপের টিকিট পাবে। অর্থাৎ দক্ষিণ আফ্রিকা শীর্ষ আটে থাকায় নবম অবস্থানে থাকা দলটিরও সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ তৈরি হয়।
সেই হিসাবেই বাংলাদেশ সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে ওয়ানডে র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে। আফগানিস্তান আট নম্বরে উঠে সরাসরি বিশ্বকাপ নিশ্চিত করার পর বাংলাদেশের জন্যও সমীকরণ পরিষ্কার হয়ে যায়। অন্যদিকে দশম স্থানে থাকা ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে আর বাংলাদেশকে টপকে সরাসরি জায়গা করে নেওয়ার সুযোগ থাকল না।
ফলে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি খেলার টিকিট নিশ্চিত করা দলগুলোর তালিকায় এখন বাংলাদেশের নামও রয়েছে।
২০২৭ বিশ্বকাপে সরাসরি খেলবে যারা
বাংলাদেশের সঙ্গে ২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা নিশ্চিত করেছে ভারত, অস্ট্রেলিয়া, পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা, ইংল্যান্ড ও আফগানিস্তান।
স্বাগতিক হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকা ও জিম্বাবুয়েও খেলবে বিশ্বকাপের মূল পর্বে।
অর্থাৎ ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ওয়ানডে আসরের মূল পর্বে সরাসরি জায়গা পাওয়া দলগুলোর তালিকা এখন অনেকটাই পরিষ্কার। আর সেই তালিকায় বাংলাদেশও নিশ্চিতভাবে রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য এটি বিশেষভাবে স্বস্তির খবর। কারণ সরাসরি বিশ্বকাপে জায়গা নিশ্চিত হওয়ায় দলকে আর বাছাইপর্বের অনিশ্চিত লড়াইয়ে নামতে হচ্ছে না।
অন্যদিকে আফগানিস্তানের জয়কে সবচেয়ে বড় দুঃসংবাদ হিসেবে দেখছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। র্যাঙ্কিংয়ে দশম স্থানে থাকা ক্যারিবীয় দলটির সামনে এখন আর সরাসরি বিশ্বকাপে খেলার কোনো পথ খোলা নেই।
ভারতের বিপক্ষে ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুটি ওয়ানডে এখনো বাকি। কিন্তু ওই দুটি ম্যাচ জিতলেও র্যাঙ্কিংয়ের হিসাবে বাংলাদেশকে টপকে সরাসরি বিশ্বকাপের জায়গা নেওয়া সম্ভব হবে না।
ফলে দুইবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের আবারও বাছাইপর্বের পথ ধরতে হবে।
এটি ওয়েস্ট ইন্ডিজের জন্য মোটেও নতুন অভিজ্ঞতা নয়। ২০১৯ বিশ্বকাপের আগে বাছাইপর্ব খেলেছিল ক্যারিবীয়রা। সেবার অবশ্য তারা সফলভাবে বাধা পেরিয়ে মূল বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছিল।
কিন্তু ২০২৩ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে ঘটে যায় বড় বিপর্যয়। সুপার সিক্সে জিম্বাবুয়ে ও নেদারল্যান্ডসের কাছে হারের পর তাদের বিশ্বকাপের সম্ভাবনা কঠিন হয়ে যায়। পরে স্কটল্যান্ডের কাছে হেরে নিশ্চিত হয় বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে পড়া।
সেটিই ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ওয়েস্ট ইন্ডিজের মূল পর্বে জায়গা না পাওয়ার ঘটনা। এরপর সেই ব্যর্থতার প্রভাব পড়ে ২০২৫ চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতেও। সেখানেও জায়গা হয়নি ক্যারিবীয়দের। এখন ২০২৭ বিশ্বকাপের আগে আবারও একই পরীক্ষার সামনে দাঁড়িয়ে তারা।
শুধু বাছাইপর্ব নয়, সামনে ‘সুপার সিরিজ’
ওয়েস্ট ইন্ডিজকে এবার শুধু বাছাইপর্বে ভালো করলেই হবে না, বিশ্বকাপের মূল পর্বে যাওয়ার পথে আরও একটি ধাপ পেরোতে হতে পারে।
২০২৭ বিশ্বকাপের বাছাইপর্বে মোট ১০টি দল অংশ নেওয়ার কথা। ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও আয়ারল্যান্ডের মতো পূর্ণ সদস্য দেশের পাশাপাশি বিশ্বকাপ লিগ-২ থেকে চারটি দল এবং প্লে-অফ থেকে আরও চারটি দল বাছাইপর্বে জায়গা পাবে।
বাছাইপর্বে চ্যাম্পিয়ন দল সরাসরি বিশ্বকাপের দ্বিতীয় রাউন্ডে খেলার সুযোগ পাবে। কিন্তু দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে থাকা দলকে খেলতে হবে ‘সুপার সিরিজ’।
তিন দলের এই লড়াই থেকে সেরা দলটি পাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে যাওয়ার সুযোগ।
অর্থাৎ ওয়েস্ট ইন্ডিজের সামনে পথটি সহজ নয়। একাধিক ধাপ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের মূল পর্বে জায়গা করে নিতে হবে তাদের।
রশিদ খানের ব্যাটে আফগানিস্তানের বিশ্বকাপের টিকিট
আফগানিস্তানের বিশ্বকাপ নিশ্চিত হওয়ার গল্পের নায়ক অবশ্যই রশিদ খান। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে ২০৭ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে ১৭৬ রানে ৭ উইকেট হারানোর পর আফগানিস্তানের জয় নিয়ে তৈরি হয়েছিল অনিশ্চয়তা।
সেই সময় দায়িত্ব নেন রশিদ। ৩৭ রানে অপরাজিত থেকে দলকে জয়ের বন্দরে পৌঁছে দেন তিনি।
এর আগে বল হাতেও ছিলেন দুর্দান্ত। ৪৪ রান দিয়ে ৩ উইকেট নিয়েছেন আফগান অধিনায়ক। ফলে ব্যাট ও বল—দুই বিভাগেই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে ম্যাচসেরার পুরস্কার জিতেছেন তিনি।
রহমানউল্লাহ গুরবাজের ৭১ রানও আফগানিস্তানের জয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে।
আফগানিস্তানের এই জয় তাদের টানা চতুর্থ ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলা নিশ্চিত করেছে। একই সঙ্গে বদলে দিয়েছে বিশ্বকাপের বাছাইপর্বের সমীকরণও।
তথ্যসূত্র: চ্যানেল ২৪
