
ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদি সম্প্রতি দুর্বৃত্তের গুলিতে নিহত হওয়ার পর নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে ‘গানম্যান’ প্রসঙ্গ।
নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় রাজনৈতিক নেতা ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একটি তালিকা প্রস্তুত করেছে সরকার। এ ছাড়া ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছেন একাধিক ব্যক্তি। কেউ গানম্যান চেয়েছেন, আবার কেউ ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্সের আবেদন করেছেন। এসব আবেদনের প্রেক্ষিতে এখন পর্যন্ত অন্তত ২০ জনের জন্য গানম্যান নিয়োগ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জানিয়েছেন, আরও কারা ঝুঁকিতে রয়েছেন তা যাচাই-বাছাই করছে পুলিশের বিশেষ শাখা। সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে এমনিতেই নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তার মধ্যে গানম্যান নিয়োগের প্রক্রিয়া ও যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অনেকে।
কেউ কেউ মনে করছেন, গানম্যান বা ব্যক্তিগত অস্ত্রের লাইসেন্স দেওয়া হলে নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, ব্যক্তিভিত্তিক নিরাপত্তার পরিবর্তে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনগণের আস্থা তৈরি করাই বেশি জরুরি।
এ বিষয়ে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, নির্বাচনী সময়ে সবার জন্য আলাদা নিরাপত্তা দেওয়া বাস্তবসম্মত নয়। যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও হামলার ঘটনা ঘটে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

যেভাবে হয় যাচাই ও নিয়োগ
বাংলাদেশে গানম্যান বা বডিগার্ড পাওয়ার বিষয়টি কোনো সাধারণ অধিকার নয়। এটি মূলত ব্যক্তির নিরাপত্তা ঝুঁকি ও রাষ্ট্রীয় প্রটোকলের ওপর নির্ভর করে এবং সরকারের বিশেষ বিবেচনায় অনুমোদিত হয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চাইলে কারও বিশেষ ঝুঁকি বিবেচনায় তাকে গানম্যান বরাদ্দ দিতে পারে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, রাজনৈতিক ঝুঁকি, গুরুত্বপূর্ণ মামলার সাক্ষী হওয়া বা বিশেষ নিরাপত্তা হুমকির ক্ষেত্রে সরকার অনেক সময় নিজ উদ্যোগেই নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেয়। তবে সাধারণভাবে কেউ গানম্যান বা বডিগার্ড চাইলে লিখিতভাবে পুলিশ বা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়।
আবেদনের পর গোয়েন্দা সংস্থা বা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চ আবেদনকারীর ঝুঁকি যাচাই করে। তদন্তে দেখা হয়, নিরাপত্তার প্রয়োজন বাস্তব কি না, নাকি কেবল প্রভাব বিস্তারের উদ্দেশ্যে আবেদন করা হয়েছে। কর্মকর্তারা বলছেন, এই যাচাই প্রক্রিয়া দীর্ঘ ও কঠোর।
সাধারণত মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রটেকশন ইউনিট থেকে বডিগার্ড এবং স্পেশাল ব্রাঞ্চ বা বিশেষ শাখা থেকে গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়। নিরাপত্তা বিশ্লেষক নাসির উদ্দিন আহাম্মেদ বলেন, যাচাই শেষে প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্য নিয়োগ করা হয় এবং এক্ষেত্রে যার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে তার মতামতও বিবেচনায় নেওয়া হয়।
তিনি জানান, গানম্যান সরকারি অস্ত্র ও নির্ধারিত গুলি ব্যবহার করেন এবং এর সব ব্যয় সরকার বহন করে। তবে প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে আনসার ভিডিপির সদস্য নিয়োগের ব্যবস্থাও রয়েছে।
কে এবং কেন গানম্যান পায়?
বাংলাদেশে সরকারি প্রটোকল বা পদাধিকার অনুযায়ী রাষ্ট্রের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি গানম্যান বা সশস্ত্র দেহরক্ষী পেয়ে থাকেন। এই তালিকায় রয়েছেন রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিচারপতি, সচিব বা সমপর্যায়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং সশস্ত্র বাহিনীর প্রধানরা।
পুলিশের সাবেক প্রধান নুরুল হুদা বলেন, কেউ ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য পুলিশের কাছে আবেদন করতে পারেন, তবে গানম্যান বা বডিগার্ড দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনায় এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া অস্বাভাবিক নয় বলেও তিনি মন্তব্য করেন। তবে যাকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে, তার প্রকৃত ঝুঁকি থাকা জরুরি।
এদিকে সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ জানান, কোনো সাধারণ নাগরিক বা প্রভাবশালী ব্যক্তি যদি মনে করেন তার জীবন ঝুঁকিতে রয়েছে, তবে তিনি আদালতের কাছেও পুলিশি নিরাপত্তা বা গানম্যান চেয়ে আবেদন করতে পারেন। সংবিধান অনুযায়ী নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এ ছাড়া অনেকে নিজ খরচে ব্যক্তিগত গানম্যান নিয়োগ করেন। সে ক্ষেত্রে গানম্যানের নিজের নামে অস্ত্রের লাইসেন্স থাকতে হবে অথবা নিয়োগকর্তার লাইসেন্সে তাকে ‘রিটেইনার’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। সরকার অনুমোদিত বেসরকারি সিকিউরিটি কোম্পানি থেকেও নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে গানম্যান নেওয়া যায়, তবে আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে জেলা প্রশাসকের বিশেষ অনুমতি প্রয়োজন।
উল্লেখ্য, অতীতেও নিরাপত্তা ঝুঁকির কারণে বিশেষ বিবেচনায় গানম্যান নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪ সালে মুক্তমনা লেখক ও বুদ্ধিজীবীদের ওপর হামলার পর ২৬২ জন বিশিষ্ট ব্যক্তির নিরাপত্তায় সাদা পোশাকে গানম্যান মোতায়েন করা হয়েছিল।

রাজনৈতিক নেতাদের গানম্যান দেওয়া নিয়ে বিতর্ক, প্রশ্নে সার্বিক নিরাপত্তা
দুর্বৃত্তের গুলিতে ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর থেকেই রাজনৈতিক নেতাদের নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা তীব্র হয়েছে। বিশেষ করে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীর বক্তব্যের পর ‘গানম্যান’ ইস্যুটি নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে আসে। তিনি জানান, নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় সম্প্রতি অন্তত ২০ জনকে গানম্যান দেওয়া হয়েছে এবং প্রয়োজনে আরও দেওয়া হতে পারে।
এর পর থেকেই অনেক রাজনৈতিক নেতা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য সরকারের কাছে গানম্যান চেয়ে আবেদন করেছেন। পাশাপাশি গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সরকারও কয়েকজনের জন্য নিজ উদ্যোগে গানম্যান নিযুক্ত করেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ।
তাদের মতে, দেশের সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ঠিক না থাকলে একজন বা দুইজন গানম্যান দিয়ে প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। গণঅধিকার পরিষদের সভাপতি নুরুল হক নুর নিজের ওপর হামলার বিচার না হওয়া পর্যন্ত সরকারি গানম্যান গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন।
দলটির সাধারণ সম্পাদক রাশেদ খান বলেন, রাজনীতিবিদদের নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের ভাবনা ইতিবাচক হলেও নির্বাচনের আগে সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা উন্নত না হলে তা ফলপ্রসূ হবে না।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক নাসির উদ্দিন আহাম্মেদের মতে, অপরাধের বিচার নিশ্চিত না হলে গানম্যান দেওয়ার সুফল পাওয়া যাবে না। আর সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, নির্বাচনের আগে অস্ত্রধারী নিরাপত্তা নির্বাচনকে প্রভাবিত করতে পারে—এ বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা প্রয়োজন।



