
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা গতকাল বুধবার প্রতীক বরাদ্দ পাওয়ার মধ্য দিয়ে আজ বৃহস্পতিবার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নির্বাচনী প্রচারণায় নেমেছেন। নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘোষিত আচরণবিধি অনুযায়ী, আগামী ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত প্রার্থীরা প্রচারণা চালাতে পারবেন। ফলে প্রচারের জন্য মোট ২০ দিন সময় পাচ্ছেন অংশগ্রহণকারী প্রার্থীরা।
অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচনী প্রচারণা বিষয়ে একাধিক কড়া নির্দেশনা জারি করেছে ইসি। সব প্রার্থী, রাজনৈতিক দল ও সংশ্লিষ্টদের আচরণবিধি কঠোরভাবে মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে কমিশন।
ধর্মীয় বক্তব্য ও বিদ্বেষমূলক প্রচার নিষিদ্ধ
নির্বাচনী আচরণবিধিমালা অনুযায়ী, প্রার্থীরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন। তবে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত হানতে পারে-এমন বক্তব্য, বিদ্বেষমূলক প্রচার কিংবা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
পোস্টার নিষিদ্ধ-নির্বাচনে নতুন দৃষ্টান্ত
এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টার ব্যবহারে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। একই সঙ্গে যেকোনো ধরনের প্রচার সামগ্রীতে পলিথিন ও রেকসিন ব্যবহারও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
সভা-সমাবেশে অনুমতির শর্ত
নির্বাচনী জনসভা বা সমাবেশ আয়োজনের ক্ষেত্রে দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা না থাকলেও, সভা আয়োজনের অন্তত ২৪ ঘণ্টা আগে জনসভার দিন-তারিখ ও সময় লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানাতে হবে।
জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে সড়ক, মহাসড়ক কিংবা জনপথে সভা বা পথসভা করলে ব্যবস্থা নেবে ইসি। এছাড়া প্রার্থীর পক্ষে বিদেশে কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের সভা-সমাবেশ আয়োজনও নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
বিলবোর্ড, ব্যানার ও ফেস্টুনে কড়া সীমা
একজন প্রার্থী সর্বোচ্চ ২০টি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবেন। প্রতিটি বিলবোর্ডের দৈর্ঘ্য সর্বোচ্চ ১৬ ফুট এবং প্রস্থ ৯ ফুটের বেশি হতে পারবে না।
আচরণবিধিতে আরও বলা হয়েছে-
- ব্যানার হতে হবে সর্বোচ্চ ১০ ফুট বাই ৪ ফুট
- লিফলেট বা হ্যান্ডবিলের আয়তন সর্বোচ্চ এ-ফোর সাইজ
- ফেস্টুনের মাপ সর্বোচ্চ ১৮ ইঞ্চি বাই ২৪ ইঞ্চি
- সব প্রচার সামগ্রী হতে হবে সাদা-কালো
ছবি ব্যবহারে কঠোর নিয়ম
ব্যানার, লিফলেট বা ফেস্টুনে প্রার্থীর প্রতীক ও নিজের ছবি ছাড়া অন্য কোনো ব্যক্তির ছবি ব্যবহার করা যাবে না।
প্রার্থীর ছবি অবশ্যই পোর্ট্রেট আকারের হতে হবে এবং ছবির আয়তন সর্বোচ্চ ৬০ সেন্টিমিটার বাই ৪৫ সেন্টিমিটার।
নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের মনোনীত প্রার্থীরা কেবল দলীয় প্রধানের ছবি ব্যবহার করতে পারবেন। নির্বাচনী প্রতীকের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ বা উচ্চতা ৩ মিটারের বেশি হতে পারবে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও এআই ব্যবহারে বিধিনিষেধ
প্রার্থী, নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রতিনিধি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার চালাতে পারবেন। তবে প্রচার শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ফেসবুক পেজ, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইলসহ শনাক্তকরণ তথ্য রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে জমা দিতে হবে।
অসৎ উদ্দেশ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। গুজব, মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য প্রচার করা যাবে না। নারী, সংখ্যালঘু বা কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।
শোভাযাত্রা, মিছিল ও যানবাহন ব্যবহার নিষিদ্ধ
নির্বাচনী প্রচারে বাস, ট্রাক, নৌযান, মোটরসাইকেলসহ যেকোনো যান্ত্রিক বাহন ব্যবহার করে মিছিল, শোডাউন বা জনসভা করা যাবে না। যানবাহনসহ বা যানবাহন ছাড়া মশাল মিছিলও নিষিদ্ধ।
এ ছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোর ক্ষেত্রে দলীয় প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক ছাড়া অন্য কেউ হেলিকপ্টার বা আকাশযান ব্যবহার করতে পারবেন না। ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি বা প্রতীক ব্যবহারও নিষিদ্ধ।
কঠোর শাস্তির বিধান
নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড, অথবা দেড় লাখ টাকা জরিমানা, কিংবা উভয় দণ্ডই হতে পারে।
দলের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ এক লাখ টাকা অর্থদণ্ড আরোপের বিধান রয়েছে। এমনকি তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বাতিল করার ক্ষমতাও নির্বাচন কমিশনের হাতে রয়েছে।
তথ্যসূত্র: জনকণ্ঠ



