জাতীয়
প্রধান খবর

গরমে বিদ্যুৎ নিয়ে শঙ্কা: দিনে লোডশেডিং হতে পারে ৩ ঘণ্টা

ইরান যুদ্ধের প্রভাব দেশের বিদ্যুৎ খাতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। জ্বালানি সংকটের কারণে গরম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বিদ্যুৎ ঘাটতির ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। যদিও সরকারিভাবে এখনো পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে বলে আশ্বস্ত করা হচ্ছে, তবে জ্বালানি খাতের বর্তমান চিত্র ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিভিন্ন স্থানে পেট্রলপাম্পে দীর্ঘ সারি, গ্যাসের অভাবে সার উৎপাদন ব্যাহত হওয়া এবং রেকর্ড দামের পরও এলপিজি বাজারে অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে।

গ্যাসের ঘাটতি এবং বড় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় বিদ্যুৎ খাতের কর্মকর্তারা আশঙ্কা করছেন, চাহিদার সর্বোচ্চ সময় অর্থাৎ পিক আওয়ারে প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত লোডশেডিং হতে পারে। এতে সারা দেশে মানুষকে প্রতিদিন দুই থেকে তিন ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকতে হতে পারে।

পরিস্থিতি মোকাবিলায়, বিশেষ করে সন্ধ্যার পর বিদ্যুতের ব্যবহার কমাতে বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়ার কথা ভাবছে সরকার। সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনায় সরকারের উচ্চপর্যায়ে ধারাবাহিক বৈঠক চলছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে জনগণের সহযোগিতা চেয়েছেন।

সন্ধ্যার পর বাড়বে লোডশেডিং

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু গতকাল বিদ্যুৎ ভবনে বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠক করেন। বৈঠকে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকানপাট বন্ধের নির্দেশনার বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। সামনের দিনগুলোতে লোডশেডিং বাড়ার ইঙ্গিতও দেন তিনি।

বৈঠকে উপস্থিত একটি সূত্র জানায়, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন বিদ্যুৎমন্ত্রী। এতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে এবং লোডশেডিংয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন মূলত আমদানিনির্ভর গ্যাস, কয়লা ও ফার্নেস অয়েলের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় বৈশ্বিক যেকোনো অস্থিরতায় এর প্রভাব পড়ে।

বর্তমানে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে প্রতিদিন প্রায় ৯২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে, যার মাধ্যমে দিনে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে।

তবে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) এক অভ্যন্তরীণ বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গ্যাস সরবরাহ যদি ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুটের নিচে নেমে আসে, তাহলে বিদ্যুৎ উৎপাদন সাড়ে ৪ হাজার মেগাওয়াটের নিচে নেমে যেতে পারে।

পিডিবির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, জ্বালানির সরবরাহ স্থিতিশীল থাকলেও এপ্রিলে-মে মাসে দেশে বিদ্যুতের সর্বোচ্চ চাহিদা দাঁড়াতে পারে প্রায় ১৮ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট। এর বিপরীতে সম্ভাব্য উৎপাদন হতে পারে মাত্র ১৬ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।

পিডিবির সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। কয়লার বড় অংশই আমদানি করা হয়, গ্যাসেরও একটি অংশ আমদানি করতে হয়। তাই সরবরাহের স্থিতিশীলতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।’

তিনি আরও বলেন, ‘এপ্রিল-মে মাসে যে ৯০০ থেকে ৯৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়ার কথা ছিল, আমরা হয়তো তার পুরোটা পাব না। তবে খোলাবাজার (স্পট মার্কেট) থেকে কেনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ঠিক সময়ে দেশে এসে পৌঁছালে ঘাটতির কিছুটা পূরণ করা সম্ভব হতে পারে।’

বিদ্যুতের চাহিদা আবহাওয়ার ওপরও নির্ভর করবে বলে মনে করেন পিডিবির এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে এবং তাপমাত্রা সহনীয় পর্যায়ে থাকলে বিদ্যুৎব্যবস্থায় চাপ কিছুটা কমতে পারে।

গতকাল দেশে ১৫ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বিদ্যুৎ সরবরাহ ছিল ১৪ হাজার ৯০০ মেগাওয়াট। সাধারণত এক হাজার মেগাওয়াট ঘাটতি হলে সারা দেশে এক থেকে দেড় ঘণ্টা লোডশেডিং হয়। তবে ২০২২ সালের সংকটের অভিজ্ঞতায় দেখা যায়, শহর ও গ্রামের লোডশেডিংয়ে বেশ পার্থক্য থাকে। সে সময় রাজধানীতে এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলেও গ্রামাঞ্চলে তিন থেকে চার ঘণ্টা মানুষকে বিদ্যুৎবিহীন থাকতে হতো।

মার্চের শুরুতে দেশে প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট লোডশেডিং ছিল। দীর্ঘ ঈদের ছুটিতে বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকায় তা কিছুটা কমে এলেও এখন আবার লোডশেডিং বাড়ছে।

এদিকে ফার্নেস অয়েলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা বকেয়া থাকায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। বকেয়া পরিশোধ না করা হলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা সম্ভব হবে না বলে সতর্ক করেছেন কেন্দ্রগুলোর পরিচালনাকারীরা। এতে বিদ্যুৎ সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

অন্যদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, এপ্রিলে দেশে একাধিক তাপপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। এতে বিদ্যুতের চাহিদা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

ব্যবসায়ীদের আপত্তি

গতকালের বৈঠকে ব্যবসায়ী নেতারা রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়ার দাবি জানান। তবে বিদ্যুৎমন্ত্রী এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আপাতত মন্ত্রিসভার নির্দেশ অনুযায়ী সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখতে হবে।

ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, আগামী তিন মাস পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হবে। পয়লা বৈশাখ ও ঈদুল আজহার আগে এই নির্দেশনা পুনর্মূল্যায়ন করা হতে পারে। তবে আপাতত মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত মেনে চলতে হবে।

তিনি আরও জানান, সরকারি গাড়িতে জ্বালানি বরাদ্দ ৭০ শতাংশ কমানো হয়েছে, কারপুলিং উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং অফিসের সময় কমানো হয়েছে। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতি সপ্তাহে আংশিক অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার বিষয়েও সিদ্ধান্ত আসতে পারে।

মন্ত্রী বলেন, মানুষ যখন জানবে যে সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে দোকান বন্ধ হয়ে যায়, তখন কেনাকাটার অভ্যাসও ধীরে ধীরে বদলে যাবে। তবে বিশেষ বিবেচনায় ফার্মেসি ও খাবারের দোকান খোলা রাখা যেতে পারে।

তবে ব্যবসায়ী নেতাদের দাবি, শুধু মার্কেটের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা যৌক্তিক নয়। তাদের মতে, অনেক মার্কেটে বিদ্যুতের ব্যবহার আবাসিক ভবন বা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় কম, তবু তাদের ওপরই বেশি কড়াকড়ি আরোপ করা হচ্ছে।

তারা সতর্ক করে বলেন, দোকানপাট আগে বন্ধ করা হলে বাণিজ্যিক এলাকাগুলো অন্ধকার হয়ে পড়বে, এতে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। এর পরিবর্তে যেসব জায়গায় বিদ্যুতের অপচয় বেশি হয়, সেখানে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

ব্যবসায়ীরা কয়েকটি বিকল্প প্রস্তাবও দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দোকান খোলা রাখা, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ-বিশেষ করে ব্যাটারিচালিত রিকশার অবৈধ চার্জিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং বড় ব্যক্তিগত গাড়িতে জ্বালানি সরবরাহ সীমিত করা।

এ ছাড়া ‘অড-ইভেন’ বা জোড়-বিজোড় নম্বর প্লেট অনুযায়ী গাড়ি চলাচলের একটি পদ্ধতি চালুর প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা। এতে জোড় নম্বরের গাড়ি জোড় তারিখে এবং বিজোড় নম্বরের গাড়ি বিজোড় তারিখে চলবে।

ব্যবসায়ীরা জানান, করোনা মহামারি এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ক্ষতি এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি তারা। এর ওপর নতুন এই সংকট ব্যবসায়ীদের জন্য আরও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন বলেন, ব্যবসায়ীরা আপাতত সন্ধ্যা ৬টার মধ্যে দোকান বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। তবে সময়সীমা পরিবর্তনের দাবি তারা অব্যাহত রাখবেন।

সূত্র: ডেইলি স্টার বাংলা

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button