জাতীয়
প্রধান খবর

রোহিঙ্গা ঢলের ৯ বছর পূর্তি, মিয়ানমারে ফেরানো যায়নি কাউকে

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে অভ্যন্তরীণ সংঘাত, জান্তা সরকারের দমন-পীড়ন ও নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গার বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পূর্ণ হলো আজ। তবে দীর্ঘ এই সময়ে একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে পারেনি বাংলাদেশ। কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন শুরু হবে, সে বিষয়েও এখনো স্পষ্ট কোনো রোডম্যাপ নেই।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান ও সহিংসতার মুখে প্রাণভয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করেন রোহিঙ্গারা। কয়েক দিনের মধ্যেই প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এরপর সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অ্যারেঞ্জমেন্টসহ নানা উদ্যোগ নেয় ঢাকা। তবে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও নানা জটিলতা তৈরি হয়।

২০১৯ সালে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের মধ্য দিয়ে সংকট সমাধানে নতুন আশার সৃষ্টি হলেও শেষ পর্যন্ত বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরু করা সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ সময়ে প্রথম দফায় প্রায় ৮০ হাজার এবং সম্প্রতি আরও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি ছাড়াই কিছু অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাকেও বাস্তবে ফেরত পাঠানো যায়নি।

বর্তমানে সংকট সমাধানে চীনের ওপর আস্থা রাখতে চাইছে বাংলাদেশ। ভূরাজনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে ঢাকা-বেইজিং-নেপিদো ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগে প্রত্যাবাসনের পথ খুলতে পারে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরেও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার অঙ্গীকার করেছে চীন।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে বাংলাদেশ আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেও কাজ করে এ সংকট সমাধানের পথে এগোনো সম্ভব বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।

এদিকে প্রায় ১৫ লাখ মানুষের এই সংকটকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনায় ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একের পর এক বৈশ্বিক সংকট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগও দ্রুত এক ইস্যু থেকে অন্য ইস্যুতে সরে যাচ্ছে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান বিশ্বে একের পর এক সংকট তৈরি হচ্ছে। ফলে একটি সংকট থেকে আরেকটি সংকটে বিশ্বের মনোযোগ বদলে যাচ্ছে। তবে বাংলাদেশের বর্তমান প্রেসিডেন্সির মাধ্যমে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও বিশ্ববাসীর নজরে আনা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সব মিলিয়ে ১৫ লাখের বেশি মিয়ানমারের নাগরিকের দায়ভার এখন বাংলাদেশের কাঁধে। দীর্ঘদিন ধরে রোহিঙ্গাদের ভরণপোষণে বৈশ্বিক সহায়তাও কমছে। ফলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও অন্যান্য মৌলিক সেবা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের ওপর চাপ বাড়ছে। ২০২৬ সালেও আন্তর্জাতিক সহায়তার ঘাটতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, রোহিঙ্গা সংকটকে শুধু মানবিক সমস্যা হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার বিষয়টিও জড়িত। ক্যাম্পগুলোতে অপরাধ, মাদক পাচার ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। তাই প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি রোহিঙ্গারা যাতে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে না পারে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।

সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান বলেন, চীন মনে করে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ, মিয়ানমার ও চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তোলার এবং বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে লাভবান হওয়ার বড় সুযোগ রয়েছে। তাই রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন গুরুত্বপূর্ণ ও অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে বলে আশা করা যায়। এ বিষয়ে বাংলাদেশের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।

অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের হত্যা ও জাতিগত নিধনের দায়ে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ারও তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

নয় বছর ধরে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনই এখন সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা। কিন্তু রাখাইনের চলমান সংঘাত, নিরাপত্তাহীনতা ও নাগরিকত্বের প্রশ্নের সমাধান না হওয়ায় কবে সেই প্রত্যাবাসন শুরু হবে, তার উত্তর এখনো অজানা।

তথ্যসূত্র: যমুনা টিভি

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button