রাজনীতি
প্রধান খবর

যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বদলে গেল আইনসভার নিয়ন্ত্রণ, বাংলাদেশে এমন হলে কী হতো?

প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসেই থাকছেন, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের আইনসভার দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের হাতে। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ না হলেও তাঁর প্রশাসনের আইন প্রণয়ন, বাজেট ও নীতিগত সিদ্ধান্তে বাধা তৈরি হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের এই নির্বাচনী ব্যবস্থা বাংলাদেশে থাকলে কী হতো? মাঝপথে ভোট দিয়ে কি জনগণ সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলে দিতে পারত?

যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট- কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছে। অথচ প্রেসিডেন্ট পদে বহাল থাকছেন রিপাবলিকান ডোনাল্ড ট্রাম্প।

বিষয়টি অনেকের কাছে কিছুটা অস্বাভাবিক মনে হতে পারে। কারণ সাধারণভাবে নির্বাচনে কোনো দলের জয় বা পরাজয়ের সঙ্গে সরকার পরিবর্তনের বিষয়টি জড়িয়ে থাকে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামো এমন যে, প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চলমান থাকলেও আইনসভার নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে চলে যেতে পারে।

এবার দেখা যাক, এই ব্যবস্থা কীভাবে কাজ করে এবং বাংলাদেশে এমন নির্বাচন হলে কী ঘটত।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন আসলে কী?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। তবে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের দুই বছর পর কংগ্রেসের সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। একে বলা হয় মিডটার্ম বা মধ্যবর্তী নির্বাচন।

এই নির্বাচনে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করা হয় না। বরং প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সবগুলো এবং সিনেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট হয়।

যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস (আইনসভা) দুটি কক্ষ নিয়ে গঠিত। প্রতিনিধি পরিষদে মোট ৪৩৫টি আসন এবং সিনেটে ১০০টি আসন রয়েছে।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় এখন আইন প্রণয়ন, বাজেট অনুমোদন, সরকারি কার্যক্রমের তদন্ত এবং প্রশাসনের জবাবদিহি নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে তাদের ভূমিকা অনেক বেড়ে যাবে।

অর্থাৎ ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট থাকলেও তাঁর রাজনৈতিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য কংগ্রেসের সঙ্গে সমঝোতা করতে হবে।

প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চললেও আইনসভার নিয়ন্ত্রণ বদলে যায় কীভাবে?

যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট এবং কংগ্রেস আলাদা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হন।

প্রেসিডেন্টের মেয়াদ চার বছর। অন্যদিকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর। সিনেটরদের মেয়াদ ছয় বছর।

ফলে প্রতি দুই বছর পর প্রতিনিধি পরিষদের সব আসনে এবং সিনেটের এক-তৃতীয়াংশ আসনে নির্বাচন হয়। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ কংগ্রেসের রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পরিবর্তন করতে পারে।

এ কারণেই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার দুই বছর পর তাঁর দলের জনপ্রিয়তা বা সরকারের কর্মকাণ্ডের মূল্যায়ন করার সুযোগ তৈরি হয়।

এবার বাংলাদেশের কথা ভাবুন

ধরা যাক, বাংলাদেশেও যুক্তরাষ্ট্রের মতো মধ্যবর্তী নির্বাচনব্যবস্থা চালু রয়েছে।

একটি জাতীয় নির্বাচনে কোনো দল ৩০০টি সংসদীয় আসনের মধ্যে ২০০টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করল। কিন্তু সরকারের মেয়াদের আড়াই বছর পর আবার মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলো।

এবার জনগণ ভোট দিয়ে আবার সংসদ সদস্য নির্বাচন করল। নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেল, ক্ষমতাসীন দলের আসন কমে গেছে। অন্যদিকে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে।

অর্থাৎ জনগণের ভোটে সংসদের রাজনৈতিক সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলে গেল।

এমন ব্যবস্থা থাকলে সরকারকে পাঁচ বছর পরপর নির্বাচনের অপেক্ষা করতে হতো না। বরং মেয়াদের মাঝপথেই জনগণ সরকারের কাজের মূল্যায়ন করে নিজেদের মতামত জানাতে পারত।

বাংলাদেশের বর্তমান ব্যবস্থায় এমন হলে কী হতো?

এখানেই যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় পার্থক্য।

বাংলাদেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা চালু রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল।

সংবিধান অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন হারালে তাঁকে পদত্যাগ করতে হবে অথবা সংসদ ভেঙে দেওয়ার পরামর্শ দিতে হবে।

তাই বাংলাদেশে মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিরোধী দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলে শুধু সংসদের নিয়ন্ত্রণ বদলানোর বিষয়টি থাকবে না- সরকারের নেতৃত্ব পরিবর্তনের সাংবিধানিক পরিস্থিতিও তৈরি হতে পারে।

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট ও আইনসভার সদস্যরা আলাদাভাবে নির্বাচিত হওয়ায় কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী দলের হাতে গেলেও প্রেসিডেন্ট তাঁর নির্ধারিত মেয়াদ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করতে পারেন।

অর্থাৎ দুই দেশের সরকারব্যবস্থার পার্থক্যের কারণেই একই ধরনের নির্বাচনের ফলাফল ভিন্ন হবে।

বাংলাদেশে এমন নির্বাচন চালু হলে জনগণের কী সুবিধা হতো?

প্রথমত, সরকারের জবাবদিহি বাড়ত। নির্বাচনের পর সরকার পাঁচ বছর পর্যন্ত জনগণের মূল্যায়নের বাইরে থাকার সুযোগ পেত না।

দ্বিতীয়ত, বিরোধী দল সংসদে আরও শক্তিশালী ভূমিকা রাখতে পারত। সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত, বাজেট, উন্নয়ন প্রকল্প ও প্রশাসনিক কার্যক্রম নিয়ে নিয়মিত প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি হতো।

তৃতীয়ত, সরকারের জনপ্রিয়তা কমে গেলে জনগণ মেয়াদের মাঝপথেই ভোটের মাধ্যমে তার প্রতিফলন ঘটাতে পারত।

তবে ঘন ঘন নির্বাচন হলে রাজনৈতিক অস্থিরতা, নির্বাচনী ব্যয় এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও রয়েছে।

তাহলে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো ব্যবস্থা চালু করা সম্ভব?

তাত্ত্বিকভাবে সম্ভব হলেও বাংলাদেশের বর্তমান সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় হুবহু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন পদ্ধতি চালু করা যাবে না।

কারণ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট শাসিত ব্যবস্থা এবং বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থা এক নয়। বাংলাদেশের সংসদের মেয়াদ, সংসদ সদস্যদের নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর অবস্থান এবং সরকার গঠনের নিয়ম সংবিধান দ্বারা নির্ধারিত।

তাই এমন ব্যবস্থা চালু করতে হলে সংবিধান ও নির্বাচনী কাঠামোয় প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনতে হবে। পাশাপাশি মধ্যবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মেয়াদ, আগের সংসদের অবস্থান এবং নতুন সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে সরকার পরিচালনার নিয়মও স্পষ্ট করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের মূল শিক্ষা হলো, গণতন্ত্রে শুধু সরকার গঠন করাই শেষ কথা নয়- সরকারের ক্ষমতার ওপর কার্যকর নজরদারি এবং জনগণের কাছে জবাবদিহিও নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের মতো মধ্যবর্তী নির্বাচন হলে মেয়াদের মাঝপথে জনগণের ভোটে সংসদের রাজনৈতিক ভারসাম্য বদলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হতো। তবে বাংলাদেশের সংসদীয় ব্যবস্থায় এর প্রভাব যুক্তরাষ্ট্রের মতো শুধু আইনসভার নিয়ন্ত্রণ পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত না। সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে সরকার পরিচালনার দায়িত্বেও পরিবর্তন আসতে পারত।

সহজ কথায়, যুক্তরাষ্ট্রে মধ্যবর্তী নির্বাচনে জনগণ প্রেসিডেন্টের মেয়াদ অপরিবর্তিত রেখেই কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ বদলে দিতে পারে। আর বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা চালু হলে সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বদলে যাওয়ার সঙ্গে সরকার পরিচালনার নেতৃত্বও পরিবর্তিত হওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button