ধর্ম
প্রধান খবর

রমজানে রান্নাঘরই যেন নারীদের ইবাদতের ময়দান

রমজান আত্মশুদ্ধি, সংযম ও আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের মাস। এ মাসে মুমিনরা নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ও নানা ইবাদতে নিজেদের ব্যস্ত রাখেন। তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা অনেক সময় আমাদের দৃষ্টির বাইরে থেকে যায়-একজন মা বা গৃহিণীর রান্নাঘরও রমজানে ইবাদতের এক বিশেষ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে।

সাহরি প্রস্তুত করা, ইফতার আয়োজন করা, রোজা রেখে পরিবারের সদস্যদের দেখাশোনা করা-এসব কাজ কেবল পারিবারিক দায়িত্ব নয়; সঠিক নিয়ত থাকলে এগুলো মহান আল্লাহর কাছে উচ্চ মর্যাদার ইবাদত হিসেবে গণ্য হয়।

নিয়তের আলোকে জীবনই ইবাদত

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“বলুন, নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু-সবই বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।” -কোরআন, সুরা আল-আনআম, আয়াত: ১৬২

আলেমদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, একজন মুমিন যদি দৈনন্দিন কাজও আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করেন, তবে সেটিও ইবাদতের মর্যাদা পায়।

সেবার মাধ্যমে ইবাদত

আল্লাহ তাআলা আরও বলেন:
“তোমরা সৎকর্ম ও তাকওয়ার কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো।” – কোরআন, সুরা আল-মায়িদা, আয়াত: ২

প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম ইবনে কাসির (রহ.) ব্যাখ্যায় বলেন, মানুষের ইবাদত ও কল্যাণের কাজে সহযোগিতা করাও নিজেই নেক আমল। রমজানে একজন মা যখন সাহরি প্রস্তুত করেন বা ইফতার আয়োজন করেন, তখন তিনি পরিবারের সদস্যদের ইবাদতের সহায়ক ভূমিকা পালন করেন। ফলে তার শ্রমও তাকওয়ার পথে সহযোগিতা হিসেবে গণ্য হয়।

ইফতার করানোর ফজিলত

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন:
“যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, সে তার সমপরিমাণ সওয়াব পাবে, অথচ রোজাদারের সওয়াব থেকে কিছুই কমানো হবে না।” – তিরমিজি, হাদিস: ৮০৭

ইমাম নববী (রহ.) উল্লেখ করেন, সামান্য খাবার দিয়েও ইফতার করানো যায় এবং এতে বিপুল সওয়াবের আশা করা যায়। একজন মা যখন প্রতিদিন পরিবারের একাধিক সদস্যের জন্য ইফতার প্রস্তুত করেন, তখন তিনি বহু রোজাদারের ইফতারের সওয়াবের অংশীদার হন।

সাহরির বরকত

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমরা সাহরি খাও; কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।” – সহিহ বুখারি, হাদিস: ১৯২৩

হাদিসবিশারদ ইবন হাজর আসকালানী (রহ.) বলেন, সাহরি রোজাদারকে ইবাদতে শক্তি জোগায়। অতএব, সাহরি প্রস্তুতকারীরাও পরোক্ষভাবে ইবাদতের শক্তি জোগানোর কাজে অংশগ্রহণ করেন।

নিয়তই চাবিকাঠি

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিস:
“নিশ্চয়ই সকল কাজ নিয়তের ওপর নির্ভরশীল।” – সহিহ বুখারি, হাদিস: ১

ইবন তাইমিয়্যা (রহ.) বলেন, মুমিনের অভ্যাসগত কাজও সৎ নিয়তের কারণে ইবাদতে পরিণত হয়। তাই রান্না, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বা পরিবারের সেবা-সবই আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে করলে ইবাদত হয়ে যায়।

ধৈর্যের মর্যাদা

আল্লাহ তাআলা বলেন:
“নিশ্চয়ই ধৈর্যশীলদের তাদের প্রতিদান দেওয়া হবে হিসাব ছাড়াই।”- কোরআন, সুরা আজ-জুমার, আয়াত: ১০

ইমাম কুরতুবী (রহ.) বলেন, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য বৈধ কাজে ধৈর্য ধারণ করাও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। রমজানে একজন মা ক্লান্তি ও কষ্ট সহ্য করে পরিবারের জন্য কাজ করেন-এই নীরব ত্যাগও আল্লাহর কাছে মূল্যবান।

সামাজিক সচেতনতার প্রয়োজন

রমজানের এ বাস্তবতা আমাদের সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিকেও পরিবর্তন করতে শেখায়। পরিবারের অন্য সদস্যদের উচিত নারীদের এই শ্রমকে সম্মান করা, কাজে সহযোগিতা করা এবং তাদের ইবাদতের সুযোগ সৃষ্টি করা। ইসলাম পারস্পরিক সহমর্মিতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেয়।

রমজান শুধু মসজিদের ইবাদতে সীমাবদ্ধ নয়; একটি রান্নাঘরও এ মাসে সওয়াবের মহাময় ময়দানে পরিণত হতে পারে। সাহরি প্রস্তুত করা, ইফতার আয়োজন করা, পরিবারের সেবা করা-সবই যদি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে হয়, তবে প্রতিটি মুহূর্তই ইবাদত।

রমজানের এ বার্তা আমাদের ঘর, পরিবার ও সমাজকে আরও কৃতজ্ঞ, সহমর্মী ও ইবাদতমুখী করে তুলুক।

লেখখ: পরিচালক, মিফতাহুল জান্নাত মহিলা মাদরাসা, কাঁঠালতলা, মুন্সিগঞ্জ।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button