
ইসলামে সপ্তাহের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ। হাদিসে এ দিনকে মুসলিমদের জন্য আল্লাহ তাআলার বিশেষ নেয়ামতপূর্ণ দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এ দিনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হজরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি, জান্নাতে প্রবেশ এবং সেখান থেকে পৃথিবীতে আগমনের ঘটনা। কিয়ামতও সংঘটিত হবে এ দিনে। এ ছাড়া জুমার দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো বান্দা আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করলে তা কবুল হওয়ার সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আমরা দুনিয়ায় পরে আগমনকারী হলেও কিয়ামতের দিন অগ্রগামী হব। অন্যদের আমাদের আগে আসমানি কিতাব দেওয়া হয়েছিল। তাদের ওপর একটি বিশেষ দিনে ইবাদতের বিধান দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা এ বিষয়ে মতভেদ করেছে। আল্লাহ আমাদের সঠিক দিনের পথ দেখিয়েছেন। তাই এ ক্ষেত্রে মানুষ আমাদের অনুসরণ করে। ইহুদিদের দিন শনিবার আর খ্রিষ্টানদের দিন রবিবার। (সহিহ বুখারি, হাদিস ৮৭৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৫৫)
জুমার দিনের পাঁচ বিশেষ ফজিলত
হজরত আবু লুবাবা ইবনে আবদুল মুনযির (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, নিশ্চয়ই জুমার দিন সব দিনের সর্দার। আল্লাহর কাছে এ দিন ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতরের দিন থেকেও মহান।
হাদিসে জুমার দিনের পাঁচটি বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে-
১. এ দিন আল্লাহ তাআলা আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করেছেন।
২. এ দিন তাঁকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন।
৩. এ দিনই তাঁর মৃত্যু হয়েছে।
৪. এ দিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন কোনো বান্দা আল্লাহর কাছে কিছু চাইলে তিনি তা দান করেন, যদি সে হারাম কোনো বিষয়ের প্রার্থনা না করে।
৫. এ দিনই কিয়ামত সংঘটিত হবে।
জুমার দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি বিষয় হলো, বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে অর্থাৎ জুমার রাতে মানুষের আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয় বলে একটি হাদিসে বর্ণিত হয়েছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতি বৃহস্পতিবার, জুমার রাতে আদমসন্তানের আমল পেশ করা হয়। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল কবুল করা হয় না। (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ১০২৭২; আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস ৬১২)
এ হাদিসে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার প্রতিও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই জুমার দিনের ফজিলত অর্জনের পাশাপাশি আত্মীয়তার বন্ধন অটুট রাখার ব্যাপারেও যত্নবান হওয়া জরুরি।
জুমার দিনের ফজিলত শুধু দুনিয়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। একটি হাদিসে জান্নাতের ‘ইয়াউমুল মাযীদ’ বা অতিরিক্ত প্রাপ্তির দিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এ দিন জান্নাতবাসীদের জন্য বিশেষ আনন্দ ও নেয়ামতের ব্যবস্থা থাকবে।
হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি দীর্ঘ হাদিসে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে জুমার দিনকে নবীজি (সা.) ও তাঁর উম্মতের জন্য ঈদের দিন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। একই বর্ণনায় জান্নাতে ‘ইয়াউমুল মাযীদ’-এর বিশেষ আয়োজনের কথাও এসেছে।
হাদিসটির বর্ণনায় জান্নাতবাসীদের জন্য বিশেষ পোশাক, খাবার, পানীয় ও সুগন্ধির ব্যবস্থা এবং আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। (মুসনাদে আবু ইয়ালা, হাদিস ৪২২৮; আল-মুজামুল আওসাত, তাবারানি, ৩/৫৫, হাদিস ২১০৫৪)
জুমার নামাজে এক সপ্তাহের গুনাহ মাফের সুসংবাদ
জুমার দিনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো যথাযথভাবে জুমার নামাজ আদায় করা। পরিচ্ছন্ন হয়ে, উত্তম পোশাক পরে, সময়মতো মসজিদে উপস্থিত হওয়া এবং মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনা এ দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমল।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহের জন্য জুমা কাফফারা বা পাপমোচনের মাধ্যম হয়, যদি কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা হয়। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৩৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ১০৮৬; জামে তিরমিজি, হাদিস ৪১৪; সহিহ ইবনে খুযায়মা, হাদিস ১৮১৪)
জুমার নামাজের ফজিলত সম্পর্কে আরেকটি হাদিসে এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সময়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহ মাফের কথা এসেছে।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি উত্তমরূপে অজু করে জুমার নামাজে উপস্থিত হয়, মনোযোগ দিয়ে খুতবা শোনে এবং নীরব থাকে, তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ এবং অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়। আর যে কঙ্কর স্পর্শ করল, সে অনর্থক কাজ করল। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ৮৫৭; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১০৫০; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস ৯৪৮৪; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস ১২৩১)
হাদিসগুলোতে গুনাহ মাফের যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে, তা কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকা এবং নামাজ ও খুতবার আদব রক্ষার গুরুত্বের সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই শুধু জুমার নামাজে উপস্থিত হওয়াই নয়, যথাযথ নিয়মে তা আদায় করাও জরুরি।
জুমার দিনের গুরুত্বপূর্ণ আমলগুলো কী?
জুমার দিনের ফজিলত অর্জনের জন্য কয়েকটি আমলের প্রতি বিশেষভাবে যত্নবান হওয়া প্রয়োজন।
গোসল ও পরিচ্ছন্নতা: জুমার দিন গোসল করা, সাধ্যমতো শরীর পরিচ্ছন্ন রাখা এবং সুন্দর পোশাক পরিধান করা।
সুগন্ধি ব্যবহার: সামর্থ্য ও সুযোগ থাকলে সুগন্ধি ব্যবহার করা।
আগেভাগে মসজিদে যাওয়া: সময় হাতে নিয়ে মসজিদে উপস্থিত হওয়া এবং নামাজের আগে সামর্থ্য অনুযায়ী নফল নামাজ ও জিকিরে মশগুল থাকা।
মুসল্লিদের কষ্ট না দেওয়া: মসজিদে আগে থেকে বসে থাকা মানুষের ঘাড় ডিঙিয়ে সামনে যাওয়ার চেষ্টা না করা। দুজনের মাঝে ফাঁক তৈরি করে তাঁদের কষ্ট দিয়ে বসাও পরিহার করা।
খুতবা মনোযোগ দিয়ে শোনা: ইমাম খুতবা দেওয়ার সময় কথা বলা বা অন্য কাজে ব্যস্ত না থেকে নীরব থাকা।
অনর্থক কাজ পরিহার: খুতবা চলাকালে কঙ্কর নাড়াচাড়া করা কিংবা মনোযোগ নষ্ট হয়-এমন কাজে লিপ্ত না হওয়া।



