
চলতি বিশ্বকাপের শেষ বত্রিশের লড়াইয়ে বসনিয়া ও হার্জেগোভিনার বিপক্ষে ২-০ গোলে জয় পেলেও, যুক্তরাষ্ট্রের ফরোয়ার্ড ফ্লোরিয়ান বালোগানের লাল কার্ডের ঘটনাটি এখন ফুটবল দুনিয়ায় ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। এই সিদ্ধান্তের বিপরীতে লিওনেল মেসির সাম্প্রতিক একটি ঘটনার তুলনা টেনে প্রশ্ন উঠেছে-রেফারিদের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কি ভিন্ন ভিন্ন মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে?
বৃহস্পতিবার (২ জুলাই) সান ফ্রান্সিসকোর লেভিস স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ম্যাচে দ্বিতীয়ার্ধের ৬৪ মিনিটে লাল কার্ড দেখেন বালোগান। বসনিয়ার ডিফেন্ডার তারিক মুহারেমোভিচকে ট্যাকল করতে গিয়ে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে তার পায়ে আঘাত করেন এই ফরোয়ার্ড। মাঠের ব্রাজিলিয়ান রেফারি রাফায়েল ক্লাউস শুরুতে কোনো ফাউলের বাঁশি না বাজালেও, ভিএআর পর্যালোচনার পর সরাসরি লাল কার্ড দেখান।
ম্যাচশেষে যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনো থেকে শুরু করে ফুটবল বিশ্লেষক রিও ফার্ডিনান্ড-সবারই প্রশ্ন, মেসির ক্ষেত্রে নিয়ম শিথিল হলো কেন? বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার ডিফেন্ডার মান্দিকে একই ধরনের ট্যাকল করেন আর্জেন্টাইন মহাতারকা। তা সত্ত্বেও মেসিকে কোনো কার্ড দেখানো হয়নি, অথচ বালোগানের ক্ষেত্রে ভিএআর ব্যবহার করে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
বিবিসিতে ধারাভাষ্য দেওয়া ইংল্যান্ডের সাবেক ডিফেন্ডার রিও ফার্ডিনান্ড বলেন, ‘ঠিক এই জায়গাগুলোতেই মানুষ ভিএআর নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সবাই নিয়মের একই প্রয়োগ দেখতে চায়। আলজেরিয়ার বিপক্ষে মেসির সেই ট্যাকল আমাদের সবার মনে আছে। অনেকেরই ধারণা, ওটা সরাসরি লাল কার্ড পাওয়ার মতো অপরাধ ছিল, অথচ সেটি ঠিকঠাক খতিয়ে দেখা হলো না, কোনো শাস্তিও দেওয়া হলো না। আর এখন বালোগানের ট্যাকলটা দেখুন-ভিএআর মাঝে নাক গলাল, রেফারি মনিটর দেখতে গেলেন এবং আচমকাই সরাসরি লাল কার্ড দেখিয়ে দেওয়া হলো। এই যে আলাদা নিয়ম, এটাই খেলোয়াড়, কোচ ও সমর্থকদের সবচেয়ে বেশি হতাশ করে।’
বিবিসির হয়ে ধারাভাষ্য দেওয়ার সময় ইংল্যান্ড নারী ফুটবল দলের সাবেক স্ট্রাইকার সু স্মিথ ঘটনাটি নিয়ে বলেন, ‘রিপ্লে দেখার সময় ফ্রেমটা যখন আটকে রাখা হয়, তখন আপনার মনে হতেই পারে, এটা শতভাগ লাল কার্ড পাওয়ার মতোই অপরাধ। কিন্তু স্বাভাবিক গতিতে দেখলে সিদ্ধান্তটা বড্ড বেশির কঠোর মনে হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘দুর্ভাগ্যবশত তার পা-টা ভুল জায়গায় পড়ে গেছে।’
বিশ্বকাপের ধারাভাষ্যকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক ফরোয়ার্ড ক্লিন্ট ডেম্পসিও লাল কার্ডের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেন। তার ভাষায়, ‘মাঠের খেলা নিয়ে কথা বলার বদলে এখন আমাদের রেফারিদের নিয়ে কথা বলতে হচ্ছে। আমার মনে হয় যুক্তরাষ্ট্রকে বড্ড বেশি শাস্তি দেওয়া হয়েছে। ফ্লোরিয়ান বালোগান এমন কোনো অপরাধ করেনি, যার জন্য ওকে সরাসরি লাল কার্ড দেখাতে হবে। এত বড় একটা ম্যাচে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে আপনাকে শতভাগ নিশ্চিত হতে হবে, যা পরে ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করে দিতে পারে।’
যুক্তরাষ্ট্রের কোচ মরিসিও পচেত্তিনোও সরাসরি দাবি করেছেন, এটি কোনোভাবেই লাল কার্ডের মতো ফাউল ছিল না। তিনি বলেন, ‘এটা কখনোই লাল কার্ড হতে পারে না। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের পা মাড়িয়ে দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্যই ওর ছিল না।’ মেসির একই রকম ঘটনা নিয়ে জানতে চাইলে এই আর্জেন্টাইন কোচের দাবি, ‘দুটির কোনোটিই লাল কার্ড পাওয়ার মতো ফাউল ছিল না।’
ফুটবলপ্রেমীদের একাংশের মতে, প্রযুক্তির ব্যবহারে যখন ফুটবলকে আরও নিখুঁত করার চেষ্টা করা হয়, তখন একই ধরনের ঘটনার জন্য ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত সিস্টেমের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বিশেষ করে মেসির মতো তারকার ক্ষেত্রে নমনীয়তা এবং বালোগানের ক্ষেত্রে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় রেফারিংয়ের ধারাবাহিকতা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
শেষ ষোলোয় বেলজিয়ামের বিপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রকে খেলতে হবে বালোগানকে ছাড়াই। ফলে এই সিদ্ধান্তটি শুধু একটি লাল কার্ডের বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং বিশ্বকাপে ভিএআর প্রয়োগের ধারাবাহিকতা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের মানদণ্ড নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: চ্যানেল ২৪