ফুটবল
প্রধান খবর

লাল কার্ড থেকে বিশ্বকাপ জয়, আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির যত রেকর্ড

লিওনেল মেসির আর্জেন্টিনা জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণার মধ্য দিয়ে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে চলা ফুটবলের এক ঐতিহাসিক অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। এই দীর্ঘ সময়ে তিনি জিতেছেন একটি বিশ্বকাপ ও দুটি কোপা আমেরিকা শিরোপা, গড়েছেন ও ভেঙেছেন অসংখ্য রেকর্ড এবং আর্জেন্টিনা ও বিশ্ব ফুটবলে রেখে গেছেন অমলিন ছাপ।

২০০৫ সালের আগস্টে হাঙ্গেরির বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে বদলি হিসেবে নেমে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়ার সেই দুর্ভাগ্যজনক অভিষেক থেকে শুরু করে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে পরাজয় পর্যন্ত- আর্জেন্টিনার জার্সিতে মেসির পথচলা ছিল রেকর্ড, সাফল্য ও আবেগে ভরা।

জাতীয় দলের হয়ে তিনি খেলেছেন ২০৭ ম্যাচ। করেছেন ১২৫ গোল এবং ৬৮টি গোলে সহায়তা করেছেন। এই পরিসংখ্যান তাকে আলবিসেলেস্তেদের ইতিহাসের সবচেয়ে প্রভাবশালী খেলোয়াড় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

রোসারিওতে জন্ম নেওয়া এই তারকা আর্জেন্টিনার আগের কিংবদন্তি ১০ নম্বর জার্সিধারী দিয়েগো আরমান্দো ম্যারাডোনাসহ গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতা, অ্যানহেল ডি মারিয়া ও হাভিয়ের মাসচেরানোর বিভিন্ন রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছেন।

দুই শতাধিক ম্যাচ খেলে মেসি আর্জেন্টিনার ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার হয়েছেন। গোলের তালিকাতেও তার অবস্থান সবার ওপরে। তার ১২৫ গোলের ধারেকাছেও নেই কেউ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা গ্যাব্রিয়েল বাতিস্তুতার গোল ৫৪টি এবং তৃতীয় স্থানে থাকা সার্জিও অ্যাগুয়েরোর গোল ৪১টি।

বিশ্বকাপেও মেসির নাম জড়িয়ে আছে একের পর এক রেকর্ডে। তিনি ছয়টি বিশ্বকাপ খেলেছেন-যে রেকর্ডটি তিনি কেবল পর্তুগালের ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর সঙ্গে ভাগ করে নিয়েছেন। বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ৩৪টি ম্যাচ খেলার রেকর্ড অবশ্য এককভাবে তার দখলে।

এ ছাড়া বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি সময় মাঠে থাকা, সবচেয়ে বেশি ম্যাচ জেতা এবং সবচেয়ে বেশি ম্যাচে শুরুর একাদশে থাকার রেকর্ডও মেসির।

২০ বছরের বিশ্বকাপ পথচলায় তিনি করেছেন ২১ গোল। এতে তিনি টুর্নামেন্টটির ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছেন। ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পের ২২ গোলের চেয়ে মাত্র একটি গোল পিছিয়ে তিনি। পাশাপাশি ১২টি অ্যাসিস্ট করে বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরা অ্যাসিস্টদাতাদের তালিকায় শীর্ষস্থান দখল করেছেন মেসি।

বিশ্বকাপের বাইরে, যেখানে কাতার ২০২২ জয় ছিল তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের সর্বোচ্চ শিখর, সেখানেও কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ছিল তার অসাধারণ আধিপত্য।

বর্তমানে ইন্টার মায়ামিতে খেলা এই ফরোয়ার্ড কোপা আমেরিকার ইতিহাসে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা। ৩৯ ম্যাচে তার গোল ১৪টি। তার সামনে রয়েছেন কেবল নরবার্তো মেন্দেস, যিনি ১৯৪৫, ১৯৪৬ ও ১৯৪৭ সালের কোপা আমেরিকায় মোট ১৭ গোল করেছিলেন।

দক্ষিণ আমেরিকা অঞ্চলের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে মেসি খেলেছেন ৭২ ম্যাচ এবং করেছেন ৩৬ গোল। এ ছাড়া লন্ডনে অনুষ্ঠিত ২০২২ সালের ফাইনালিসিমায় ইতালির বিপক্ষে ৩-০ গোলের জয়ে দুটি অ্যাসিস্ট করে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি।

আর্জেন্টিনার হয়ে মেসির প্রথম আন্তর্জাতিক সাফল্য এসেছিল যুব পর্যায়ে। ২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতেন তিনি। এরপর ২০০৮ সালের বেইজিং অলিম্পিকে আর্জেন্টিনাকে এনে দেন স্বর্ণপদক।

তবে মূল জাতীয় দলের হয়ে একটি বড় ট্রফি জিততে তাকে অপেক্ষা করতে হয়েছে এক দশকেরও বেশি সময়।

বছরের পর বছর বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন এই ১০ নম্বর তারকা। একটি বড় ট্রফির স্বপ্ন নিয়ে অবিরাম লড়াইয়ের পর অবশেষে ২০২১ সালে আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণ।

রিও ডি জেনিরোর ঐতিহাসিক মারাকানা স্টেডিয়ামে তার নেতৃত্বে কোপা আমেরিকা জিতে প্রায় ৩০ বছরের শিরোপাখরা কাটায় আর্জেন্টিনা।

এরপর ক্যারিয়ারের শেষভাগে এসে একের পর এক বড় সাফল্য উপভোগ করেন মেসি। ২০২২ সালে ইতালিকে হারিয়ে জেতেন ফাইনালিসিমা। একই বছর কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনাকে নেতৃত্ব দিয়ে ৩৬ বছর পর বিশ্বকাপ জেতান তিনি।

ফ্রান্সের বিপক্ষে স্মরণীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে জোড়া গোল করেন মেসি এবং পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে জেতেন গোল্ডেন বল।

এরপর ২০২৪ সালের কোপা আমেরিকাতেও শিরোপা ধরে রাখে আর্জেন্টিনা। কলম্বিয়ার বিপক্ষে ফাইনালে গুরুতর গোড়ালির চোট নিয়ে মাঠ ছাড়তে হলেও শেষ পর্যন্ত শিরোপা জেতে তার দল।

যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে পরপর দুটি বিশ্বকাপ জেতাই ছিল মেসির শেষ বড় স্বপ্ন। তবে ফাইনালে স্পেনের কাছে হারের মধ্য দিয়েই শেষ হয় সেই স্বপ্নের যাত্রা।

স্পেনের কাছে পরাজয়ের পর মেসির চোখের জল হয়ে রইল আর্জেন্টিনার জার্সিতে ফুটবল মাঠে তার শেষ স্মৃতিচিত্র।

তবে লিওনেল মেসিকে কেউ ব্যর্থতা বা শেষ ম্যাচের হতাশা দিয়ে মনে রাখবে না। মাঠে তার অবিশ্বাস্য অর্জন, রেকর্ড এবং আর্জেন্টিনাকে দেওয়া সাফল্যই তাকে চিরস্মরণীয় করে রাখবে।

২০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আর্জেন্টিনা ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতীক হয়ে থাকা মেসি আজ বিদায় নিয়েছেন জাতীয় দল থেকে। রেখে গেছেন এক অমলিন উত্তরাধিকার, অসংখ্য স্মৃতি এবং আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে এক বিশাল শূন্যতা।

শেষ হলো একটি যুগ-শেষ হলো ‘মেসি যুগ’। তবে ফুটবল ইতিহাসে লিওনেল মেসির নাম ও উত্তরাধিকার থেকে যাবে চিরকাল।

তথ্যসূত্র: বাংলা ট্বিবিউন

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button