বগুড়া জেলা
প্রধান খবর

বগুড়ায় গাছ কাটা নিয়ে জামায়াত প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে হামলার অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক: বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলায় গাছ কাটাকে কেন্দ্র করে হামলায় তিন জন আহত হয়েছেন। এদের মধ্যে হুসেন আলী (৪৮) আহত অবস্থায় বগুড়া শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ব্যক্তি মালিকানা জায়গাকে সরকারি খাস দাবি তুলে বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনের জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী নুর মোহাম্মদ আবু তাহেরের লোকজন এই হামলা চালান।

গত শনিবার (৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় দুপচাঁচিয়া উপজেলার গুনাহার ইউনিয়নের কেউৎ গ্রামের বাজারে এ ঘটনা ঘটে। ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় সমালোচনার সৃষ্টি হয়। তবে জামায়াত ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় এমন অভিযোগ উঠছে। এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন।

হুসেন আলী কেউৎ গ্রামের বাসিন্দা। এখানকার প্রায় ৩ একর সাড়ে ৬ শতাংশ জমির কেয়ারটেকার হিসেবে দায়িত্বে আছেন। এই জমির মূল মালিক ৬ জন। তারা হলেন, আদমদীঘির বড় আখিরা গ্রামের শুভাশীষ কুমার মণ্ডল, দেবাশীষ কুমার মণ্ডল, শ্রী পরিতোষ কুমার, শ্রী অসিত কুমার, শ্রী সন্তোষ কুমার ও শ্রী গোপাল কুমার মণ্ডল। হুসেন আলীর পরিবারের দাবি, ৩ একর সাড়ে ৬ শতাংশ জমি এক সময় অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে খাস খতিয়ানভুক্ত হয়েছিল। পরে দলিল অনুযায়ী শুভাশীষ কুমার মণ্ডল ও তার স্বজনেরা আদালতে এই খাস জমিগুলো ফিরে পেতে মামলা করেন। ২০১৪ সালে সেই মামলার রায় পান আদমদীঘির ওই ৬ ব্যক্তি। তখন থেকে জায়গা দেখভালের জন্য কেয়ারটেকার হিসেবে হুসেন আলীকে দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা জানান, এরপর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে সকল জমির ইজারা বাতিল করে উপজেলা প্রশাসন। মালিকানা ফিরে পেয়ে ২০২১-২২ সালে এই ৩ একর সাড়ে ৬ শতাংশ জায়গা নিজের নামে খারিজ করে নেন ৬ মালিক। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আদালতের রায় থাকলেও গ্রামের বাসিন্দারা জায়গার দখল ছাড়তে চাইছিল না।

এসব নিয়ে সহকারী ভূমি কমিশনার, স্থানীয় চেয়ারম্যান পর্যায়ে বেশ কয়েকবার বৈঠক হয়। পরবর্তীতে বিভিন্ন বৈঠকে শুভাশীষ, দেবাশীষ মণ্ডলদের পরিবার স্থানীয়দের দাবি অনুযায়ী ১৫ শতক জায়গার ওপর একটি মন্দির, গ্রামের কবরস্থানের জন্য প্রায় ১০-১২ শতক জায়গা দিয়েছেন।

সম্প্রতি একই ইউনিয়নের রবিউল ইসলাম ও জাহাঙ্গীর আলম নামে দুই ব্যক্তি এই সম্পত্তির মধ্যে ২ একর ৫৫ শতাংশ জমি গাছসহ বায়নামূলে ক্রয় করেন। গত শুক্রবার তারা জমির এক অংশের কিছু গাছ কাটার উদ্যোগ নেন। খবর পেয়ে স্থানীয় কতিপয় ব্যক্তি গাছ কাটতে বাধা দেন। বাধার মুখেও গাছগুলো কাটা হয়। তবে পরের দিন গাছগুলো ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার সময় শনিবার সন্ধ্যায় হুসেন আলীর ওপর হামলা করে দুর্বৃত্ত। হামলায় হুসেন আলী (৪৮), তার ভাই মহসীন আলী(৪০) ও ভাতিজা ওমর আল রাফি(১৩) আহত হন। এ ছাড়া ৩ টি অটোভ্যান ভাঙচুর করা হয়। হুসেনের মেয়ে হোসনে আরা বলেন, যারা হামলা চালিয়েছে তারা সবাই জামায়াত প্রার্থী নুর মোহাম্মদ আবু তাহেরের নির্দেশে চলে। নুরের চাচাতো ভাই মাসুদও আছেন এ ঘটনায়।

শনিবার সন্ধ্যায় বাজারে চা খেতে গিয়েছিলেন আমার বাবা। ওই সময় ২০-৩০ জনের একটি দল এসে আমার বাবা ও অন্যদের ওপর হামলা চালানো হয়। আমার বাবার কোনো দোষ নেই। তারপরেও তাকে মারধর করে ওরা। আমি এই হামলার বিচার চাই বলে দাবি জানান হোসনে আরা।

কেউৎ গ্রামের ওই সম্পত্তির বায়নামূলে মালিক রবিউল ইসলাম ও জাহাঙ্গীরের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, শুক্রবার গাছ কাটতে এলে আমাদের লোকজনকে বাধা দেয় কতিপয় ছেলে। পরে আমরা ঘটনাস্থলে এলে তাকে ফোন দিলে বন্ধ পাই। পরে বিকেলে সৈকত নামে একজন ফোন দিয়ে কথা বলে। পরে সে আর আসেনি। কিন্তু শনিবার গাছ কেটে নিয়ে ভ্যানে তুলে শ্রমিকরা নিয়ে যাবে ওই সময় নুর মোহাম্মদ আবু তাহেরের লোকজন পরিচয়ে বেশ কয়েকজন হুসেন আলীকে মারধর করে।

এই জমির মূল মালিক শুভাশীষ-দেবাশীষ মণ্ডল পরিবারের প্রতিনিধি ও সান্তাহারের বাসিন্দা মোস্তাফিজুর রহমান জানান, কেউৎ গ্রামে যে তাদের জমি ছিল সেটিও জানতেন না এই জমিদার পরিবারের সদস্যরা। পুরোনো কাগজ ঘাটতে গিয়ে জানা যায়। পরে আদালতের মাধ্যমে রায় পান তারা।

প্রথম দিকে এই জায়গা দখলে নিতে বৈঠকে তৎকালীন চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ আবু তাহের আমাদের পক্ষেই বলেছিলেন। না করেও উপায় নেই, কারণ কাগজ, নথিপত্র সব আমাদের পক্ষে। তারপরেও তাদের দাবির প্রেক্ষিতে আমরা মন্দিরের, কবরস্থানের জন্য জায়গা দিয়েছি।

মোস্তাফিজুর জানান, ওই গ্রামের সনাতন ধর্মের কয়েকজন ব্যক্তি আছেন। তারাই মূলত এই জমিগুলোকে এখনও খাস বলে প্রচার করছে। তারা জামায়াতের প্রার্থী নুর মোহাম্মদের লোকজনের সহায়তায় হুসেন আলীর ওপর হামলা করেছেন।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে বগুড়া-৩ (আদমদীঘি-দুপচাঁচিয়া) আসনের জামায়াত ইসলামীর প্রার্থী নুর মোহাম্মদ আবু তাহেরের মোবাইলে সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এ সময় তার ব্যক্তিগত সহকারী শামিম হোসেন দাবি করেন, হুসেন আলী কেউৎ গ্রামের বাসিন্দা। গ্রামের বেশ কিছু সরকারি জায়গা লিজ নিয়ে তিনি এবং এলাকাবাসী সরকারের কাছে ডেকে নিয়ে নিজেদের মতো চাষাবাদ করেন তিনি। বেশ কিছু আগে থেকে তিনি বলে বেড়াচ্ছিলেন এই জায়গাগুলোর মালিকানা আছে। সে সময় হুসেন আলী সরকারি কিছু গাছ কেটে বিক্রি করেছিল। তখন গ্রামবাসীর অভিযোগের ভিত্তিতে তৎকালীন ইউপি চেয়ারম্যান নুর মোহাম্মদ একটা মিটিং ডাকেন। মিটিংয়ে আলোচনা সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত হয় সরকারি জায়গায় কোনো গাছ কেউ কাটতে পারবে না।

জামায়াতে ইসলামীর নুর মোহাম্মদ আবু তাহেরের ব্যক্তিগত সহকারী বলেন, শুক্রবার আবার সেই জায়গায় গাছ কাটার চেষ্টা করে হুসেন আলী। সেখানে কে বা কাহারা বাধা দেয়। সেটি ওরাও ঠিক করে বলতে পারেন না। পরে এ ঘটনা নিয়ে মারামারি হয়। এতে আমাদের লোকজন, বা নুর মোহাম্মদ ভাইয়ের চাচাতো ভাই মাসুদের থাকার কথা বলা হচ্ছে এটা পুরাই ভিত্তিহীন। এখানে রাজনৈতিক কিছু প্রতিপক্ষ থাকে। নুর মোহাম্মদ ভাইকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা হিসেবে অভিযুক্ত করা হচ্ছে। কারো জায়গা-জমি নিয়ে তার কোনো মাথাব্যাথা নেই।

এ ঘটনায় দুপচাঁচিয়া থানার ওসি আফজাল হোসেন বলেন, খবর পেয়ে আজ থানার তদন্ত পরিদর্শক নাসিরুল ইসলাম বিট অফিসার নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তবে এ ঘটনায় এখনও কোনো লিখিত অভিযোগ দেয়া হয়নি। অভিযোগ পেলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এই বিভাগের অন্য খবর

Back to top button