বগুড়ার ভোটের উত্তাপ: মার্কা নয়, ইস্যুতেই নজর ভোটারদের
৭ আসনেই হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ে বিএনপি-জামায়াত

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর মাত্র এক দিন বাকি। শেষ মুহূর্তে এসে বগুড়ার সাতটি আসনেই ভোটের উত্তাপ চরমে। এবার শুধু দল বা প্রতীক নয়- উন্নয়ন, দ্রব্যমূল্য, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও প্রার্থীর ব্যক্তিগত গ্রহণযোগ্যতা ভোটের ফল নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছেন ভোটার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
১২টি উপজেলা ও ১১টি পৌরসভা নিয়ে গঠিত বগুড়া জেলায় মোট ভোটার ২৯ লাখ ৮১ হাজার ৯৪০ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৪ লাখ ৮০ হাজার ৮৭১ জন, নারী ভোটার ১৫ লাখ ১ হাজার ২৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪২ জন।
জেলায় ৯টি রাজনৈতিক দলের ৩৪ জন প্রার্থী বৈধ হলেও মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে। বিএনপির নেতাকর্মীরা বলছেন, বগুড়ার সাতটি আসনই দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে উপহার দিতে প্রস্তুত তারা। অন্যদিকে জামায়াতের দাবি, ৭টির মধ্যে অন্তত ৩টি আসনে জয়ের সম্ভাবনা প্রবল।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বগুড়া ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপির ঘাঁটি হলেও এবার প্রতিটি আসনেই দলটিকে ঘাম ঝরাতে হবে। বিশেষ করে বিএনপি ও জামায়াত আলাদা হয়ে যাওয়ায় ভোট বিভাজনের বাস্তব আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
শেষ সময়ে এসে বগুড়ার রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে হলফনামা নিয়ে সংঘাত।
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ) আসনে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীর বিরুদ্ধে তথ্য গোপনের অভিযোগ এনে পাল্টাপাল্টি আবেদন জমা পড়েছে রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে।
বগুড়া-৫ (শেরপুর–ধুনট) আসনে বিএনপির প্রার্থীর বিরুদ্ধে ঋণ সংক্রান্ত তথ্য গোপনের অভিযোগে সংবাদ প্রকাশ নিয়েও তীব্র বিতর্ক চলছে। যা ইতিমধ্যে হাইকোর্টের বারান্দায়। সংশ্লিষ্ট প্রার্থী এটিকে প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্রমূলক অপকৌশল বলে দাবি করেছেন।
স্বল্প জনবল নিয়েও আলোচনায় এসেছেন বগুড়ার একমাত্র নারী প্রার্থী-বাসদ মনোনীত গণতান্ত্রিক যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী দিলরুবা নূরী। তার স্লোগান-
“সংসদ যেন কোটিপতি ও দুর্বৃত্তদের ক্লাব না হয়ে গণমানুষের অধিকার আদায়ের জায়গা হয়।”
অন্যদিকে বগুড়া-২ আসনের জাতীয় পার্টির প্রার্থী ও সাবেক এমপি শরিফুল ইসলাম জিন্নাহ শেষ মুহূর্তে নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বিতর্ক উসকে দিয়েছেন। অভিযোগ করেছেন- ভোটের পরিবেশ নেই, মামলা-হামলায় নেতাকর্মীরা ঘরছাড়া। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এটি নির্বাচন ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার কৌশল।
ভোটাররা নজর দিচ্ছে ইস্যুভিত্তিক উন্নয়নের দিকে-
বগুড়া-১ (সারিয়াকান্দি-সোনাতলা): নদীভাঙন, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য
বগুড়া-২ (শিবগঞ্জ): উন্নয়নের হিসাব, তরুণদের কর্মসংস্থান
বগুড়া-৩ (দুপচাঁচিয়া–আদমদীঘি): রেল যোগাযোগ, স্বাস্থ্য ও ক্রীড়া উন্নয়ন
বগুড়া-৪, ৫ ও ৭: কৃষিভিত্তিক শিল্প, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান উন্নয়ন
বগুড়া-৬ (সদর): যানজট, ড্রেনেজ সমস্যা- ভিআইপি আসন, কারণ এখানে প্রার্থী তারেক রহমান
তরুণ ভোটারদের বড় অংশ বলছেন, তারা আর শুধু ‘মার্কা দেখে ভোট দিতে চান না’।
কর্মসংস্থান, শিক্ষা, মানবিক মর্যাদা ও স্বচ্ছ রাজনীতিই তাদের প্রধান চাওয়া।
হিজড়া ভোটার প্রীতি বলেন,
“আমরা যেন শুধু আশ্বাস না পাই-শিক্ষা ও কাজের সুযোগ চাই।”
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বগুড়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হুমায়ুন ইসলাম তুহিন বলেন,
“প্রতিযোগিতা এবার হাড্ডাহাড্ডি। বিএনপি এক বা দুটি আসন হারাতেও পারে।”
বগুড়ায় এখন মাঠে-ময়দানে, সামাজিক মাধ্যমে ও ভিডিও বার্তায় চরম প্রচারণা চলছে। ভোটারদের চোখে এবার উন্নয়ন নয়, জবাবদিহিতা।
শেষ পর্যন্ত ভোটের বাক্সে কারা হাসবে-তা নির্ধারিত হবে ভোটারদের ইস্যুভিত্তিক সিদ্ধান্তেই।



